হিয়ার মাঝে (১ম পর্ব)

সাহেদা পাথরের মত মুখ করে বসে আছেন। জীবনের সবচে বড় আঘাতটি আজ তাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে! তিনি তার প্রিয়তম স্বামীকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন!
সকাল থেকেই সাহেদার বসত বাড়ি ‘নিরিবিলি হাউজে, প্রচুর লোক আসছে! তার কারন আজ সকাল দশটার সময় সাহেদার স্বামী মাহমুদুল হক মারা গেছেন। ব্যবসায়িক মহলে তার যথেষ্ট নামডাক ছিলো সে সূত্রেই লোকজনের সমাগম।
গত কয়েকমাস ধরেই মাহমুদুল হক লিউকোমিয়া সহ নানান ধরনের অসুখে ভুগছিলেন। গত মাসেও তাকে নিয়ে ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন সাহেদা! সেখানকার ডাক্তাররাও জানিয়ে দিয়েছেন তার বাঁচার কোনো আশা নেই! লিউকোমিয়ার লাষ্ট স্টেজ ছিলো এটা! চেন্নাইয়ে এক সপ্তাহ থাকার পর অবশেষে স্বামীকে নিয়ে ঢাকা চলে আসেন সাহেদা!
স্বামীর চিকিৎসার কোনো ত্র“টিই রাখেননি তিনি! কিন্তু সেখানে অহেতুক বিল বাড়ছিলো! তার চিকিৎসা করতে গিয়ে এমনিতেও টাকা খরচ হয়েছে পানির মতো! সাহেদা ভেতরে ভেতরে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছেন! কেবল স্বামীর অসুখের দুশ্চিন্তাই নয় তার রেখে যাওয়া বিরাট ব্যবসাও দেখাশোনার অভাবে দেউলিয়া হতে বসেছে! উপরন্ত আঠারো লাখ টাকার মতো দেনা হয়ে গেছে! সাহেদার মাথা খারাপ হবার যোগাড় হয়েছে! একমাত্র সন্তান ‘পৌষী’কে নিয়ে যেন অথৈ সাগরে পড়লেন তিনি!
মাহমুদুল হকের দাফন শেষে অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন! সবাই সান্ত্বনা দেবার চেয়ে বেশি সমালোচনাই করলেন! কি করা উচিত ছিলো, কি করলে আরো ভালো হতো! মেয়েকে এত নামীদামী কলেজে পড়িয়ে লাভ কি! বিয়ে দিয়ে দাও….এত বড় বাড়িতে মেয়েকে নিয়ে একা থাকা ঠিক হবেনা বলেও মন্তব্য উঠলো!
সাহেদার মাথা ভোঁ ভোঁ করছিলো! স্বামীকে শেষ বিদায় জানিয়ে অচেতনের মত জায়নামাজে পড়েছিলেন আধাঘন্টা! তিন কূলে আপন আত্মীয় বলতে এক বড়ভাই আছেন। কিন্তু সাহেদা কারো গলগ্রহ হতে চাননা! সাহস করে ‘নিরিবিলি হাউজে’ই রয়ে গেলেন! আত্মীয়দের সবাই থাকতে হবে বা দায়িত্ব নিতে হবে এই ভয়ে একে একে সটকে পড়লেন।
কিন্তু এক মাস না যেতেই সাহেদা হাড়ে মাংসে টের পেলেন যে এখানে পৌষীকে নিয়ে একা থাকা অসম্ভব হয়ে উঠছে। এতদিন যারা সম্মানের চোখে দেখতো তারাই আজ বাড়ির জানালায় ঢিল ছুঁড়ে! অকারণে চাঁদা চাইতে বাড়ি আসে! নানান অজুহাতে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে চায়! সেদিন রাতেও ছাদে হাঁটাহাঁটির শব্দ টের পেয়েছেন সাহেদা। আল্লাহর রহমত ছাদের চিলেকোঠার গেটটা লাগানো ছিলো! পৌষী আগে নিজের রুমে ঘুমাতো। বাবা মারা যাবার পর থেকে মায়ের সাথেই ঘুমায় ও!
একমাস পরে কলেজে যাবার পথেও কারা নাকি ওকে চিঠি দিয়েছে, ঢিল ছুঁড়েছে! এমনিতে পৌষী আবায়া পড়ে চলাফেরা করতো আগে! এখন মায়ের কালো বোরকাটা দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে কলেজে যেতে শুরু করলো। তারপরেও পৌষীর রূপ আর গুণের খবর পাঁচকান হতে দেরী হলো না! ওদিকে পাওনাদারদের তাগাদা বাড়লো! এক পাওনাদার বিশেষ দয়া করে তার পাওনা দুই লক্ষ টাকা মাফ করে দেবার আশ্বাস দিলেন কেবল শর্ত একটাই পৌষীকে তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে! সাহেদা বেশ বিপদেই পড়লেন। তার যত চিন্তা পৌষীকে নিয়ে! এই রূপের ডালিকে নিয়ে কোথায় যাবেন তিনি! মেয়েটা তার খুবই নরম মনের! তাকে এখনো দুনিয়ার কাঠিন্য স্পর্শ করেনি! মাত্র একুশ বছর বয়সে মেয়েটা তার জীবনের কঠিনতম সময়ে উপনীত হয়েছে! সাহেদা মনকে শক্ত করলেন,নাহ্…..তাকেই একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে!
অবশেষে মানসম্মান এক পাশে সরিয়ে রেখে বড়ভাই আমজাদ চৌধুরীকে ফোন করলেন! বড় ভাই অনেক আগেই সাহেদাকে তাঁর বাড়িতে এসে থাকার প্রস্তাব করেছিলেন কিন্তু সাহেদা মানা করে দিয়েছিলো কারণ তার ভাইবৌ এবং ভাতিজা ভাতিজীরা বড্ড বেশি আধুনিক মনের। তার পৌষী সেখানে টিকতে পারবে না! কিন্তু এখন তার অবস্থা জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মতো! তাই তিনি বড়ভাইয়ের প্রস্তাবটাই মেনে নিলেন। তাছাড়া বাড়ি বিক্রি না করলে লোন শোধ করবেন কি করে!
তাই স্থির হলো বাড়ি বিক্রি করে সাহেদা যাবতীয় লোন শোধ করবেন এবং বাকি টাকা ব্যাংকে রেখে দেবেন পৌষীর ভবিষ্যতের জন্য!
তারপর সব কাজ শেষে এক বিকেলে সাহেদা তার একমাত্র বড়ভাই আমজাদ চৌধুরীর বাড়ি এসে উঠলেন!
সেখানে ওদের মা মেয়েকে থাকার জন্য একটা রুম দেয়া হলো! সাহেদা নিজের বড় বড় সব ফার্নিচার বিক্রি করে কেবল প্রয়োজনীয় দু চারটে আসবাব নিয়ে আসলেন সাথে করে!
সাহেদার ভাইবৌ রানী সুলতানা নামেই রানী না,তার হাবভাব আর চালচলনেও এ বাড়ির রানীই বটে। আর তার তিন মেয়ে ইরা, মীরা আর নীরা তিন রাজকন্যা বললে কমই বলা হবে! আগে তারা সাহেদাকে দেখলে ফুপি ফুপি করে মোটামুটি লোক দেখানো সম্মানটুকু করতো কিন্তু সাহেদা এ বাড়িতে আসার পর তাদের আচরণে টের পেতে দেরী হলোনা যে সাহেদা এখানে আশ্রিতা! বাকি রইলো আমজাদ চৌধুরীর একমাত্র ছেলে সাহেদার ভাইপো ‘হাসান আবরার চৌধুরী রাজ’! সে এসব সাতে পাঁচে নেই। বাবা মায়ের অতি আদরের দুলাল রাজ যথেষ্ট উড়নচন্ডী স্বভাবের! গার্লফ্রেন্ড আর পার্টি রাজের নিত্যদিনের সঙ্গী। ছয়ফিট লম্বা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী রাজ নিজের মত স্বাধীন জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। তাদের বাড়িতে কে এলো আর কে গেল এসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তাই সাহেদা এবাড়িতে ওঠার দুসপ্তাহ হয়ে যাবার পরেও রাজের সাথে তাদের মা মেয়ের একবারো দেখা হলোনা!
অবশ্য সাহেদা পৌষীকে বারবার সাবধান করে দিয়ে বলেছেন-‘ওপাশের বারান্দায় একদম যাবিনা রে মা…!’
বোকা পৌষী প্রশ্ন করেছিলো-‘কেন মা…ওপাশের বারান্দায় কি আছে ?’
সাহেদা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন-‘ওপাশে রাজের রুম! সারাদিন কতো ছেলে বন্ধুরা আসে যায়! তুই পারতপক্ষে ওদের সামনে যাবি না! কখনো যদি কোনো কাজে মামী পাঠায়ও তাহলে বড় করে ঘোমটা দিয়ে যাবি!’
পৌষী মায়ের কথা মেনে ঘরের বাইরে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই বড় ওড়না দিয়ে মাথা সহ শরীরের উর্ধাংশ আবৃত করে রাখে! যার ফলে বহিরাগত অনেকেই ওকে বুঝতে পারেনা!
এই তো সেদিনই তো, বাড়ির দুটো কাজের মেয়ের একটা আসেনি বলে মামী অনুরোধের সুরে একরকম আদেশই করে বসলেন পৌষীকে!
-‘যা তো আম্মু…একটু রাহেলাকে সাহায্য করতো! বেচারী একা একা পেরে উঠছেনা!
অগত্যা পৌষীকে রাহেলার সাথে হাত লাগাতে হলো! রাহেলা দুই বালতি কাপড় ধুয়ে দিলে সেগুলো পৌষীকেই মেলে দিতে হলো! রাহেলা কেটে দিলে পৌষী মায়ের সাথে সাথে রান্নার কাজে সাহায্য করলো! এভাবে বাড়ির যাবতীয় কাজ পৌষী আর তার মা দুজনে মিলে শেষ করলো!
মামীর অনুরোধে রাজের ঘরটাও পৌষীকেই গুছাতে হলো! আর গুছাতে গিয়ে পৌষীর মনে হলো রাজের জীবনটা যথেষ্টই রাজকীয় এবং ছেলেটার বাবা মায়ের অতি আদরে বাদর বনতে দেরী হয়নি!
পুরো ঘর ভর্তি মেয়েদের ছবি। ওর ব্যায়ামের ভারী ভারী সরঞ্জামগুলো সরাতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে উঠেছে পৌষী!
কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে পৌষী। হঠাৎ বাইরে কারো পায়ের শব্দ শুনে দ্রুত বড় করে ঘোমটা দিয়ে দৌড় লাগালো পৌষী। কিন্তু নিয়তির পরিহাস! পড়বি পর মালির ঘাড়ে!
একেবারে রাজের মুখোমুখি!
বারকয়েক হর্ণ বাজাতেই দারোয়ান দৌড়ে এসে গেটটা খুলে দিলো!
রাজ গাড়ী থেকে নামতেই ওর মোবাইল বেজে উঠলো! ফোনটা কানে ঠেকিয়ে কথা বলতে বলতেই রাজ গাড়ী থেকে নামলো!
ওর সমস্ত মনোযোগ ফোনের দিকে থাকায় সে তার চারপাশের পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে অবজার্ভ করতে পারেনি! যার ফলে হঠাৎ কারো সাথে মুখোমুখি ধাক্কা লেগে রাজের হাত থেকে মোবাইলটা মাটিতে পড়ে গেলো! রাজ হতচকিত হয়ে দুহাত শূন্যে তুলে প্রথমে মাটিতে পড়ে থাকা মোবাইলের দিকে তারপর সামনের মানুষটির দিকে তাকালো।
ততক্ষণে সামনের মানুষটি দ্রুত তার মোবাইলটি মাটি থেকে তুলে তার হাতে দিয়ে সটকে পড়ার জন্য পা বাড়াতেই রাজ তাকে থামালো!
-‘হে ইউ…..আর য়্যু ব্লাইন্ড? কান্ট সি? আমার এই মোবাইলের দাম জানিস? আমার সেট ডিষ্টার্ব দিলে বুঝিস….তোকে ঠিক করে দিতে হবে!’
মেয়েটি কোনো প্রতিউত্তর দিলোনা কেবল মৃদু স্বরে ‘স্যরি….মাফ করে দিন’ বলে ঘুমটাটা টেনে আরো বড় করলো!
রাজ কেবল লাল আর হলুদ চুন্দরীর ওড়নায় ঢাকা একটা মেয়েলি অবয়ব এক ঝলকের জন্য দেখলো!
সে মেয়েটির চেহারা দেখেনি কেবল মোবাইল দেবার সময় হাতের অংশবিশেষ দেখেছে!
ঘটনার আকস্মিকতায় রাজ পুরোপুরি বিষয়টি বুঝে উঠার আগেই ঘটনাটি চোখের পলকে ঘটে গেলো।
রাজ বিরক্তি নিয়ে হাতের মোবাইলটার দিকে তাকালো! দেখলো লাইনটা এখনো কাটেনি! ওপাশ থেকে রাজের বন্ধু ফিন হ্যালো হ্যালো করছে!
রাজ পুনরায় মোবাইলটা কানে দিয়ে ঘুরে পেছন ফিরে তাকালো কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটি হাওয়া।
পুরো বারান্দা জুড়ে কোনো মানুষকে দেখা গেলোনা!
রাজ কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকে গেলো!
মোবাইলে কথা শেষ করেই মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে মারলো। তারপর শীষ বাজাতে বাজাতে পরনের গেঞ্জিটা খুলে সেটা আরেকদিকে ছুঁড়ে মেরেই হঠাৎ শীষ বাজানো থামিয়ে পুরো ঘরটা অবাক হয়ে দেখতে লাগলো! দুহাত কোমড়ে রেখে চিৎকার করে রাহেলাকে ডাকলো!
সেকেন্ডের মধ্যে রাহেলা ছুটে এলো-‘জ্বী..বাইজান?’
-‘ঘর কে গুছিয়েছে? তুই?’
-‘না তো বাইজান! আমি গুসাইনাই…মুনি অয় পুষি আফায় গুসাইসে!’
-‘পুষি কে?’ (বলেই সাথে সাথে হাত নাড়লো মাছি তাড়ানোর মতো করে)আচ্ছা…যেই গুছাক..হু এভার…আমার ডাম্বল কই রেখেছিস…ওগুলো সবসময় এখানে পড়ে থাকে! ‘বলে আঙ্গুল দিয়ে সোফার নিচটা দেখালো!
রাহেলা ভীত চোখে ঘরের চারদিক তাকিয়ে বলল-‘আমি তো কইতাম ফারিনা বাইজান পুষি আফায় কই রাকছে..!’
-‘ডাক্ তোর পুষি ক্যাটকে!’
রাহেলা যেভাবে দৌড়ে এসেছিলো সেভাবেই দৌড়ে বেরিয়ে গেলো! মিনিটখানেকের মধ্যেই দৌড়ে এসে ঘরের কোণা থেকে ডাম্বেল দুটো বের করে রাজের সামনে রেখে বলল-‘এই যে বাইজান…পাইছি! আমি যাই বাইজান?’ বলে অনুমতি চাইলো রাহেলা!
-‘হুঁ…যা…এ্যাই শোন্…আমাকে জুস দিয়ে যা!’
-‘অক্ষণি দিতাসি!’
-‘জুসে লবণ দিবি তো থাপ্রামু ধইরা….ভালো করে বানিয়ে আনবি!’
-‘আইচ্চা!’ বলে ভীত ভঙ্গিতে রাহেলা চলে গেলো!
রাজ পুরো ঘরে হাঁটতে লাগলো আর চারদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলো! ঘর গোছানোটা ইউনিক হয়েছে! দেখে মনে হচ্ছে কোনো ইন্টেরিয়র ডেকোরেটরের কাজ! ওর লাউড স্পীকারটা গেটের সামনে থেকে সরিয়ে ঘরের কোণে টবের পাশে রেখেছে। তার পাশেই সোফাটা।
রাজের বিছানাটা ফ্লোরে। সেটাতে টানটান করে বেডশীট বিছানো হয়েছে আর তার উপর মালটি কালারের কুশনগুলো এতো চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে যা কেবল একজন রুচিশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব! পুরো ঘরটা একদম নতুন লাগছে! যেমনটি সাধারণত ম্যাগাজিনে দেখতে পাওয়া যায়! পর্দাগুলোকেও বদলে ফেলা হয়েছে! কুশনের সাথে রং মিলিয়ে লাগানো হয়েছে! রাহেলা এতো নিখুঁতভাবে করেছে বিশ্বাস হয় না! তাছাড়া সে তো বললোই সে এগুলো করেনি! মা কি তাহলে কোনো নতুন কাজের
লোক রেখেছে নাকি? যাক্…যাকেই রাখা হোক্। তার কাজ রাজের পছন্দ হয়েছে!
রাজ ধপ করে ফোমের বিছানায় গড়িয়ে পড়লো!
রাহেলা গেটে টোকা দিয়ে বলল-‘বাইজান…আমুউ?’
-‘হমম…আয়!’ (রাজ এক হাঁটু ভাঁজ করে উঠে বসলো!) রাহেলা শরবতের গ্লাস সহ ট্রে টা এগিয়ে দিলো! রাজ শরবতটা তুলে নিতেই সে চলে যেতে ধরলে রাজ ডাকলো! -‘এ্যাই…দাঁড়া…শরবত ভালো না হলে তোর মাথায় ঢালবো! দাঁড়া ওখানে!’
রাহেলা ভীতভাবে ট্রে হাতে গুটিশুটি মেরে এককোণে দাঁড়ালো! রাজ বিরক্তি নিয়ে শরবতে ছোট্ট চুমুক দিলো! কারন প্রতিদিনই শরবতটাতে লবনাক্ত একটা ভাব থাকবেই!
তাছাড়া কোনদিন কড়া মিষ্টি তো কোনোদিন পানসে মিষ্টি হবেই! মেজাজ গরম হয়ে যায় রাজের! ও এমনিতেই রাগলে টেম্পার ধরে রাখতে পারেনা! কতদিন যে আছড়ে গ্লাস ভেঙ্গেছে তার হিসেব নাই! রাহেলা ভীত চোখে রাজের শরবত খাবার পরবর্তী অবস্থার কথা ভেবে ভীত চোখে তাকিয়ে আছে! রাজ এক চুমুক পান করতেই ওর কপালের কুচকানো ভাঁজগুলো মসৃণ হয়ে গেলো! এক নিঃশ্বাসে পুরো শরবত শেষ করে ‘আআহ্! বলে ঢেকুর তুলে বলল-‘যা আরেক গ্লাস নিয়ে আয়! তুই বানিয়েছিস?’
-‘পুষি আফায় বানাইসে!’
-‘তোর পুষি আফারে ডাক্…একটা থ্যাংক্স দেই! এতদিনে জুসের মতো জুস পেলাম!’
রাহেলা মাথা নেড়ে গ্লাস নিয়ে চলে গেলো! মিনিট খানেকের মধ্যেই আরেক গ্লাস জুস নিয়ে হাজির হয়ে ট্রে টা এগিয়ে দিয়ে বলল-‘পুষি আফা আইতো না..হ্যায়..ফরফুরুষের সামনে যায়না!’
রাজ কোনো কথা না বলে এক ঢোকে পুরো জুসটা গিলে গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে বললো-‘এরপর থেকে পুষি ক্যাটরে বলবি শরবত বানাতে…তুই আর বানাবিনা! শালা খ্যাত কোথাকার…জুসের মধ্যেও এক চিমটি লবন মারে! এতোদিনেও জুস বানাতে শিখলোনা! যা এখন ভাগ্ এখান থেকে..!’


রাহেলা যেন প্রাণে বাঁচলো। গ্লাস নিয়ে দৌড় দিলো!
রাতে বালিশে মাথা রাখতেই ঘুমে তলিয়ে গেলো পৌষী! সাহেদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে চোখ মুছলেন! মেয়েটা তার আজকে অনেক কাজ করেছে! রাহেলার সাথে সাথে পুরো বাড়ি গুছিয়েছে। নিজে ইচ্ছে করেই সাহেদার হাত থেকে নিয়ে সব্জি ভাজি করেছে,মাছের তরকারী রান্না করেছে! পৌষী এমনিতে খুব ভালো কাজ জানে! ছেলেবেলা থেকেই ও ঘরকন্নার কাজ আগ্রহ করেই করতো! পত্রিকায় বা টিভিকে কোনো রেসিপি দেখলে ট্রাই করতো! বাবাকে এটা সেটা বানিয়ে খাওয়াতো! আজ সেই শখে শেখা বিদ্যা পরের বাড়িতে প্রয়োজনে কাজে আসছে!
ওর বাবা বড় শখ করে ওর নাম রেখেছিলেন পৌষী! ওর জন্ম পৌষের কনকনে শীতে হয়েছিলো বলে ওর বাবা এই নামটা আদর করে ডাকতেন। ওর আসল নাম অবশ্য আকীকা করে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ রাখা হয়েছিল কিন্তু ওর কলেজের বান্ধবীরা ছাড়া কেউ ওকে ঐ নামে ডাকেনা! পৌষী নামটাই চালু হয়ে গেছে!
আজ রাতে খাবার টেবিলেও ওর বড়মামা পৌষীর রান্নার প্রশংসা করেছেন! মামী সাথে সাথেই বলেছেন-‘ভালোই হলো…এখন থেকে মাঝেমধ্যে ওর মামাকে মজার মজার রান্না করে খাওয়াবে আমাদের পৌষী….!
সাহেদা কোনো প্রতিউত্তর দেননি!
(চলবে)

Comments

comments

One thought on “হিয়ার মাঝে (১ম পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *