প্রত্যাবর্তন

১.
আমি ছুটছি। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো সমানতালে ছুটছে আমার সাথে। এই দৌঁড়পাল্লায় আমার সাথে পেরে ওঠা অসম্ভব। আমি আজ দুর্দমনীয় অন্য কেউ। অথচ এই এক মুহূর্ত আগে আমি কতটা আত্মবিলোপী ছিলাম, ভেবে আশ্চর্য হই।
মানুষ যা ভাবে তা সবসময় ঘটে না, আর যা ভাবে না তাই ঘটে। যেমন ঘটেছে আমার ক্ষেত্রে। সেই ঘটনায় হুট করেই পালটে গেছি আমি। পালটে গেছে আমার ভেতর বাহির সব। অনাকাঙ্ক্ষিত কোন এক ঘটনার আচমকা আগমন হয়ত এভাবেই আমাদের পালটে দেয়। জাগিয়ে তোলে মানুষের মধ্য ঘুমন্ত এক অন্য মানুষ, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্ত্বা।
বহুদিন হলো জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবা ছেড়ে দিয়েছি। গন্তব্যহীন এই মুহূর্তে জীবনের গন্তব্য নিয়ে ভাববার অবকাশ আমার নেই। নানারকম দুশ্চিন্তা মাথার প্রতিটি জায়গা হাতুড়িপেটা করছে। এরপরও আমি নির্লিপ্তভাবে ছুটে চলেছি আমার গন্তব্যের দিকে। আপাতত আমার গন্তব্য আমার নিজের বাড়ি, নিজের ঠিকানা!
হাপাতে হাপাতে প্রায় কাছাকাছি চলে এলাম। উপরে কালো আকাশ। নিচে ঘেউঘেউ করা কুৎসিত কালো কুকুরের দল। গা টা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। বড় কুকুরটা চিল্লাছে, লেজ নাড়িয়ে, রগচটা স্বভাবের মানুষদের মত গলা উঁচিয়ে। একে সমর্থন দিচ্ছে আরও তিনটে। রাস্তায় ঝগড়া লাগলে যেমন কয়েকজন মিলে একজনকে কোণঠাসা করে ফেলে, ঠিক তেমনি চারটা কুকুর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একটার উপরে।
কুকুরদের বাঁকানো লেজ দেখে বাবার একটা কথা মনে ভেসে উঠল। প্রায়সময় বাবা রেগে গেলে কুকুরের লেজের উদাহরণ টানতেন। বলতেন, ‘কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না।’
উফ! কী সাংঘাতিক কথা! সেকি রাগ হত আমার! এই চব্বিশ বছর বয়সে এসেও কুকুরের সাথে এক দাঁড়িপাল্লায় আমাকে উঠতে হয়! একথা শুনে চোখের সামনে যা পেতাম তাই ছুঁড়ে ফেলতাম। এরপর হয় রুমের দরজা বন্ধ করে উত্তাল সাগরের মত ফুঁসতাম, নতুবা ঘর থেকে বেরিয়ে গন্তব্যহীন হাঁটা দিতাম।
এই মুহূর্তে খুব সিগারেট খেতে মন চাইছে। জানি কাজটা ঠিক নয়। আত্মঘাতী। তবু অভ্যেস হয়ে গেছে। রাগ আর দুশ্চিন্তা এই দুই রোগে সিগারেট আমার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত নিরাময়ের কাজ করে। বাবা বলেন সিগারেটে আমি নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছি। আর আমি বলি আমি ওর প্রতি প্রেমাসক্ত। ভাত-পানি না খেলে যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনি আমার সিগারেট ছাড়া চলে না। এই নিয়ে বাবার মনে কষ্টের শেষ নেই।
বাবার সাথে ঝগড়া হলে আমি আলাদা এক পন্থায় সিগারেট খাই। তিনটা জ্বলন্ত সিগারেট একসাথে মুখে পুড়ি। সিগারেট পুড়ে শেষ হবার আগে মাথার রাগগুলো পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। গত একমাসে কতবার যে বাবার সাথে ঝগড়া হয়েছে তার হিসেব নেই। শেষমেশ অবস্থা এমন দাঁড়াল, সিগারেট বিক্রেতা সামি কাকা দূর থেকে আমাকে দেখলেই হাসিমুখে তিনটা সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাগের মুহূর্তে লোকটার এমন বিদঘুটে হাসি দেখলে সাথে সাথে মাথায় রক্ত চড়ে যেত।
বাড়ির সামনে জটলা পাকিয়ে গেছে। একটা এ্যাম্বুলেন্সও দেখা যাচ্ছে। আমাকে দেখে সবার মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। সবাই এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি কোন ভীনগ্রহের প্রাণী। এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে এলিয়েন মনে হল।
খোলা সদর দরজা দিয়ে প্রতিবেশীদের আনাগোনা চোখে পড়ছে। মায়ের কান্না ভেসে আসছে কানে। বুকের মধ্যে কেমন ধড়াসধড়াস করছে। বাবা কি তবে….? না না, কী সব উলটাপালটা ভাবছি।
মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা আর ভয়ের আলো-আঁধারি খেলা চলছে। বাবার রুমের চৌকাঠে পা রাখলাম। অমনি কেউ একজন ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দিল। চোখ তুলে দেখি হতচ্ছাড়ী রুমকি আমার সামনে অগ্নিমূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ভেজা চোখ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর। সবার সামনে চিৎকার করে বলল, ‘তুই আমার বাবাকে মেরে ফেলেছিস। তোর জন্য বাবার আজ এই অবস্থা। তোকে আমি মেরেই ফেলব।’
চড়টা আমার গায়ে সয়নি। ছোটবেলা থেকে কেউ গায়ে হাত তুলেনি। এমনকি বাবাও না। স্বভাবতই মাথায় রক্ত চড়ে গেল। স্পষ্ট টের পেলাম রক্তগুলো মগজের দশ হাজার কোটি নিউরনে টগবগ করে ফুটছে। অন্যকোন সময় হলে রুমকিটাকে আমি আলুভর্তা করে ছাড়তাম। কিন্তু সময় প্রতিকূলে। পরিবেশও। পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুমকিকে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। একদিকে ঘরভর্তি মানুষ। অন্যদিকে মাথায় ঢাকা শহরের জ্যামের মত বাবার চিন্তার গিজগিজ। বলা যায় না, এই মুহূর্তে কিছু বললে সবাই মিলে আমাকে পিষে ফেলতে পারে!
বাবার দিকে তাকালাম। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠল। সিগারেট খেয়ে ত্রিশ কদমও যাইনি, এর আগেই ফোনটা বেজে উঠেছিল। ফোনটা রুমকিই করেছিল। খুব কেঁদে কেঁদে বলেছিল, ‘বাবার অবস্থা খুব খারাপ। কেমন যেন করছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়, ভাইয়া।’
শুনে আমার কী যে হয়েছিল বুঝিনি। যে মানুষটাকে আমার সহ্যই হয় না, তার জন্যই উতলা হয়ে ছুটতে লাগলাম, যেন আমি কোন পাগলা ঘোড়া, সদ্য বাঁধন ছিঁড়ে মুক্ত হয়েছি।
ধবধবে সাদা টিশার্টে বাবার ধবধবে সৌম্য চেহারা ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে যেন এক নিষ্পাপ শিশু নিভৃতে ঘুমঘোরে স্বপ্ন দেখছে। তার বন্ধ চোখের কোণের বারান্দায় এখনও খেলছে চিকচিকে পানির বিন্দু। বুকের মাঝে রক্তক্ষরণ হল। সে ক্ষরণ ফোয়ারার মত ছুটল। আমি অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইলাম বাবার দিকে।
২.
রাজ্যের চিন্তায় মাথাটা হাবুডুবু খাচ্ছে। কখনও আশঙ্কা, কখনওবা আশার দোলাচল। নানা অলিগলি ঘুরে স্মৃতি হেঁটে ফিরে গেল বছর পাঁচেক আগে। আমি তখন বাবার বাধ্য লক্ষ্মী ছেলে। দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ তে ভর্তি হলাম। ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন আমি যখন অঘোর ঘুমের সাম্রাজ্যে ঘুরছিলাম, বাবা তখন চাতকী পাখির মত রোজকার জাতীয় পত্রিকায় আমার রোল নাম্বার খুঁজছিলেন।
রোল নাম্বারটা দেখতে পেয়ে এমন চিৎকার দিয়েছিলেন যে আমি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে খাট থেকে পড়েই গেলাম। ছোট বাচ্চাদের মত দৌঁড়ে এলেন। আমাকে কোলে তুলে নিলেন। সেকি উল্লাস বাবার! বললেন, ‘বাবা রে, আজ আমি খুব খুশি, খুউউব। তুই আমার মনের আশা পূরণ করেছিস। সাজিদের মা, দেখে যাও। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূলিকণা পায়ে মাড়াতে না পারলে কী হবে, আমার ছেলে ঠিকই সূর্যটাকে ছিনিয়ে এনেছে। তোর জন্যে আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠেছে বাবা।’
সেদিনও বাবার চোখে আজকের মত পানি চিকচিক করছিল। বাবার বলা প্রতিটি কথার মাঝে এমন কোন অদৃশ্য শক্তি ছিল যা আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বাবার হাত ধরে কথা দিয়েছিলাম বাবার সব স্বপ্ন পূরণ করব।
বলেছিলাম, ‘বাবা, তুমি শুধু আমাকে দোয়া করো। তোমার ছেলে তোমার যত অপূর্ণ ইচ্ছে আছে, সব পূরণ করবে।
বাবা খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমার চোখেমুখে বহুবার চুমো খেয়েছিলেন। খুশিতে আমার বুকটা ফেঁপেছিল। এরপর কালের স্রোতে কত সময় গড়াল। অনুভূতিগুলোর হাজারও ওঠানামা চলল। সেদিনের কথা আর মনে পড়েনি আমার। মনে থাকেনি বাবাকে দেওয়া আমার কথা।
বাবার সেদিনের পাগলামিগুলো আজও মনে পড়ে। দোকানের সব মিষ্টি এনে আশেপাশের বাসা থেকে শুরু করে পাড়ার দোকানদার, রাস্তার ফকির কাউকে বিলাতে বাকি রাখেননি। বাবার কাণ্ড দেখে আমি, মা আর রুমকি হেসেই খুন হয়েছিলাম। বাবা তার অফিসের ছোটবড় যত সহকর্মী আছে সবাইকে ফোন করেছিলেন। বাদ যায়নি কাছের দূরের আত্মীয়, বন্ধুরাও।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন পরিবেশ, নতুন সহপাঠী। সব অপরিচিত নতুনের উত্তেজনা আর মানিয়ে নেওয়ার ভয় আমার মাঝে যতটা না জেঁকে বসেছিল, তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে গেছিল বাবার মনের আনাচেকানাচে।
কত পাগলামিই না করেছিলেন বাবা। হুট করে একদিন কাউকে কিছু না বলে কতগুলো নতুন শার্ট- প্যান্ট কিনে আনলেন। টানাটানির সংসারে এতগুলো টাকা কোন খাত থেকে এসে কোন খাতে ব্যয় হয়ে গেল, তাই নিয়ে মা চিন্তায় পড়ে গেলেন।
মা বাবাকে বলেছিলেন, ‘এত টাকা কোথায় পেলে? এত কেনাকাটা। টানাটানির সংসার। অনর্থক বিলাসিতার কোন মানে হয়? ‘
বরাবরের মত বাবা শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি চাই, আমার সন্তানরা সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচুক। কারও বাঁকা দৃষ্টিপাতে তাদের মনে যেন এতটুকু কষ্ট না জন্মায়। অন্তত যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন নয়।’
মা আর কিছু বলেননি। শুধু প্রশান্তি ঢোক গিলে নিয়ে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। আর রুমকিটা তো সেদিন রাতে গাল ফুলিয়ে ভাতই খেলো না। শেষে তো বাবা বাধ্য হয়ে ওকেও তিনটা ফুলসেট ড্রেস কিনে দিয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন কখনও বকেয়া থাকার সুযোগ খুঁজে পায়নি। সবদিকে বাবার ছিল তীব্র খেয়াল। ‘কিরে খোকা কিছু লাগবে তোর?’- এই প্রশ্নটা শুনতে শুনতে বিরক্তি নিয়ে হাসতাম। নতুন ব্যাগ, খাতা-কলম, কতকত বই! শুধু ‘দরকার’ শব্দটা বলামাত্র কোথা থেকে যে কীভাবে সব এনে হাজির করতেন, খুব অবাক হতাম। মেঘ না চাইতে জল পেতে পেতে কখন ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করলাম মনেই নেই। সহজে সব পেয়ে ভুলে গেছিলাম- আমার বাবা সাধারণ একজন চাকুরীজীবী, তিনি পুরাতন চারটে শার্ট দিয়ে বছর পার করেন, বেতনের এক টাকা খরচের আগে দশবার ভাবেন, ছেলের বাসভাড়ার চিন্তা মাথায় রেখে নিজে হেঁটে যান, পায়ের জুতাগুলো শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার ধকল কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খায়, আরও কত কী!
এ্যাম্বুলেন্সের ঝাঁকুনিতে ফিরে এল দুর্ভাগা বর্তমান। শহরে দিনদুপুরে জ্যাম হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু এই মধ্যরাতের জ্যাম? এ তো পৃথিবীর ষড়যন্ত্র! অমানিশা যখন আসে তখন বোধহয় পৃথিবীর সবকিছুর সাথে সন্ধি করেই আসে। হয়ত আমার বাবাকে বুঝার চেষ্টা ছিল না কখনও। দৃষ্টি ছিল অন্ধ। অথচ আজ এই আঁধার বেলায় চোখের সামনে সবকিছু যেন দিনের আলোর মত স্পষ্ট।
চোখের সামনে বাবা শুয়ে আছেন, কেমন নির্দয় নিশ্চুপতা নিয়ে। একবার চোখ খুলে দেখছেন না। মায়ের কান্না, রুমকির কান্না, এত এত গাড়ির হর্ণ, কোন কিছুতে তার যেন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার হাতে ধরা বাবার বামের হাত। আমার হাতের আঙুল থেকে টপটপ করে আবেগ ঝরে পড়ছে, অথচ সে আবেগ বাবার হাত ভেদ করে ভেতরে যেতে পারছে না। এর চেয়ে কষ্টের সময় পৃথিবীতে আমি আর পার করিনি।
আজ কত ঘুমন্ত স্মৃতি নিজ থেকে জেগে উঠে হাই তুলছে। ঠিক পাঁচ বছর আগে প্রতিদিন সকালে আমি আর বাবা একসাথে হাঁটতে বেরুতাম। রমনার গাছপালা, ঘাস-পাখি সব আমাদের চেনা, অতি আপন। কিছুদূর হাঁটার পর বাবা আমার পিছনে পড়ে যেতেন। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে অনবরত হাঁপাতেন। আমি ছিলাম বেশ দ্রুতগামী। তাই বহুদূর গিয়ে খেয়াল করতাম- বাবা সাথে নেই। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে পেছনে বাবার কাছে ফিরে যেতাম। আর বলতাম, ‘এটুকু হেঁটেই হয়রান হয়ে গেলে?’
বাবা হাসতেন আর বলতেন, ‘এই যে আমি পিছিয়ে পড়লে তুই ছুটে আসিস, এসে তোর হাত বাড়িয়ে দিস, আমার ভীষণ ভালো লাগে। বুকের পৃথিবীতে যেন দখিনা হাওয়া বয়। কলিজা ঠাণ্ডা হয়। ক্লান্তি ভেগে যায়। আমি শক্তি পাই। তোর হাত ধরে বাকি রাস্তা হেঁটে আমার স্বাদ মেটে না। ইচ্ছে করে- অনন্তকাল ধরে হাঁটি, এই পৃথিবীর পথে।’
সেই বাবা আজ নিশ্চুপ, নিথর, নির্ভার। বাবার এই নীরবতা আমি মানতে পারছি না। মনে হচ্ছে- কেউ যেন আমার বুকটাকে ধারালো ছুরির নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করছে। মনে মনে আমি চিৎকার করি। বাবাকে বলি, ‘বাবা, তুমি উঠে বসো। চোখ খুলে দেখো। এই যে আমি, তোমার ছেলে। তোমার সাজিদ। আমাকে যতখুশি বকো। খুব করে বকো। আমি কিচ্ছু বলব না। তুমি হাঁটবে না? আমার সাথে? চলো বাবা। ওঠো বাবা।’
বাবা শুনছে না। আমার মনের কথা বাবার মনে পৌঁছাবার জন্য আজ যেন কোন ইথার নেই। দু’ফোটা ব্যথিত চোখের জল গড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর অগোচরে। সে জল আমার জিন্স প্যান্টে নীরবে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ে। এ জলে মিশে আছে এক পাপাচারী মনের অব্যক্ত যন্ত্রণা। বহুদিন পর আমি কাঁদছি। বাবার জন্য কাঁদছি। নিজের কাছে সব যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছে। জানি না, ভাগ্যে কী আছে!
৩.
জ্যাম ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছুতে পৌঁছুতে অনেকটা সময় লেগে গেল। হাতঘড়ি ফিসফিসিয়ে বলল, ‘রাত এখন বারোটা।’ এ্যাম্বুলেন্স থেকে নামতেই মামাদের দেখতে পেলাম। রুমকি নিশ্চয় ওনাদেরও ফোন করেছিল। এই ঢাকা শহরে কাছের আত্মীয় বলতে এই দুজন মামা ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। বড় মামা ইঞ্জিনিয়ার আর ছোটমামা ব্যাংকার। দুজনেই ঢাকা শহরে স্থায়ী নিবাস গড়েছেন। ওদের বাবা নিজের সন্তানের মত স্নেহ করতেন। কিন্তু কখনও ওদের কাছ থেকে কোন সুবিধা নিতেন না।
স্ট্রেচারসমেত বাবাকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ইমারজেন্সিতে ঢুকলাম। ডিউটি ডাক্তার বাবাকে সোজা ওটিতে পাঠিয়ে দিলেন। অবস্থা সিরিয়াস। ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। আমি দুচোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আমার বুকের পাথরটা বিদ্যুতের গতিতে নড়েচড়ে আরও ভালো করে চেপে বসল। অদৃশ্য কোন অস্পৃশ্য শক্তি যেন গলা টিপে ধরল। টের পেলাম, আমার নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে।
অপারেশন থিয়েটার এমন এক জায়গা যেখানে মানুষের স্বাভাবিক ইচ্ছে-অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই। আছে শুধু প্রয়োজনীয়তার বিবেচনা। ছোটবেলায় কোন একদিন ভাগ্যের ফেরে এরকমই এক আচমকা প্রয়োজনে আমাকে অপারেশন থিয়েটারে আসতে হয়েছিল। আজও এলাম। শুধু মাঝখানে কিছু পরিবর্তনের দাগ। সেদিন আমি ছিলাম ভেতরে, বাবা ছিলেন বাইরে। আজ বাবা ভেতরে, আমি বাইরে।
আমি তখন সবেমাত্র প্রথম শ্রেণির ছাত্র। চাকুরির সুবাদে বাবা বদলি হলেন খাগড়াছড়িতে। আঁকাবাঁকা সর্পিল পাহাড়ি রাস্তা, ছোটবড় পাহাড়ের সাড়ি বেঁধে স্কুলের এসেমব্লির মত দাঁড়িয়ে থাকা, তাদের বুকে মাথা উঁচু করে চোখ মেলে হাত পা ছড়ানো গাছ, উপরে সুবিশাল নীল পৃথিবী সব মিলিয়ে আমি এত্তো খুশি ছিলাম, কীভাবে বুঝাই!
পিচ্চি রুমকিটা তখন মাত্র হাঁটতে শিখেছে। ওর মুখের আধোআধো বোল আর টমেটোর মত গাল আমাদের ভালোলাগার যাদুতে মোহাবিষ্ট করে রাখতো। বাবা আমাকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করালেন। কাছে আরেকটা সাধারণ মানের স্কুল ছিল। কিন্তু বাবার ইচ্ছে ছিল তার সন্তানদের তার সর্বোচ্চটা দেওয়া।
শান্ত স্বভাব আর মনোযোগী ছাত্র হিসেবে অল্পকদিনেই সবার প্রিয় হয়ে উঠেছিলাম। খেলাধুলায়ও আমার সাথে কেউ পেরে উঠত না। এক বর্ষার দিনে টিফিন পিরিয়ডে বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে পিছলে পড়ে আমার ঠোঁট ফেটে চৌচির। পা-ও ভেঙেছিল একটা। ভয়ে ব্যথায় আমার সেকি কান্না!
প্রধান শিক্ষকের ফোন পেয়ে বাবা পাগলের মত ছুটে এসেছিলেন হাসপাতালে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আমি যখন আহত বেলুনের মত চুপসে গিয়েছিলাম, তখনই বাবার দেখা পেলাম। ওই মুহূর্তে বাবাকে পেয়ে আমি যেন পুরো পৃথিবীটা পেয়ে গেছিলাম। ভয়ার্ত ব্যথিত ব্যাকুলিত মন নিয়ে আমার আর্তনাদী কান্না থামানো যখন সবার অসাধ্য হয়ে উঠেছিল, বাবা শক্ত করে আমার হাত ধরে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় পাস নে বাবা, আমি তো আছি।’


আজ বাবার মুখ থেকে সেই কথা শুনতে ইচ্ছেরা বড্ড উড়াল দিচ্ছে। বাবার হাত ধরে বাবার মত করে বলতে সাধ জাগছে, ‘ভয় পেয়ো বা বাবা, আমি তো আছি।’
আমি আজ যতটা উদ্বিগ্ন, হয়ত বাবা সেদিন আমার মতই উদ্বিগ্ন ছিলেন, হয়ত কিঞ্চিৎ বেশিই ছিলেন। উনি কি আমার মতই অবচেতন মনে এভাবে নখ কামড়েছিলেন? কী জানি!
এত চিন্তার ভীড়েও এলোমেলো খেয়ালি প্রশ্নেরা মাথায় হামলা করছে। জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন কতগুলো পরিস্থিতি মানুষকে বাস্তবতা শিক্ষা দেয় হাতেকলমে। এই পরিস্থিতিরা অবহেলিত সম্পর্কের বেখেয়ালি অনুভূতিগুলোকে নাড়া দেয় কালবোশেখি ঝড়ের মত। ঝড়ের বিধ্বস্ত জড়দের মত আমিও যেন আজ ভীষণ বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, বিপন্নপ্রায়।
৪.
স্বপ্ন। একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু এর ভেতরে বাইরে মিশে থাকে কত আনন্দ বেদনার কাহিনী। স্বপ্ন আমিও দেখেছিলাম। নিশিদিন পড়ুয়া এই আমি তখন শেষ বর্ষের ছাত্র। লক্ষ্য ছিল প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হব। কতশত স্বপ্নের সিঁড়িঘর মাড়ানোর স্বপ্নের বিভোরতায় যখন ডুবসাঁতার খেলছিলাম, তখনই আমার সরল সাদাকালো জীবনে নেমে এলো প্রলয়ঙ্করী কালবোশেখি ঝড়। প্রচণ্ডমূর্তি নিয়ে আমার উপর আরোপিত হয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে আমাকে একেবারে দৈন্যতায় ডুবিয়ে দিল।
আমি তখন ফোর্থ ইয়ারে। মাস ছয়েক পরে ঘণ্টা বাজাবে ফাইনাল পরীক্ষা। রাতদিন পড়াশোনার দীঘিতে ডুবে থাকা আমি ভুলেই গেছিলাম নিজের চেহারা। ভুলে গেছিলাম আমিও একজন মানুষ, যার পরিবার আছে, বন্ধু আছে, সমাজ আছে, সবার প্রতি কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য আছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল এপ্রিলে। চব্বিশ তারিখে। দিনের নাম বুধ। শনিবারে শনি নামে যারা বলে, তারা ভুল বলে। আমার শনি তো বুধেই ছুঁয়েছিল পৃথিবীর বুক।
রাস্তার জ্যামে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছুতে প্রায় ঘণ্টাখানেক দেরি হয়ে গেছিল। ক্যাম্পাসে পা রেখেই দেখি ছুটাছুটি চলছে। দুই গ্রুপের মারামারি। পাশে কোন নিরাপদ জায়গা খুঁজে ওঠার আগে ধাক্কা লেগে গেল এক পক্ষের এক বড় ভাইয়ের সাথে। হাতে ইয়া বড় রামদা। সাঙ্গপাঙ্গরা আমায় যেন একপ্রকার পাকড়াওই করল। আমাকে বেধড়ক মারল তারা। কারণ হিসেবে সামনে আসলো অবাক করা এক কারণ। আমি তাদের নেতাকে নাকি ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছি। আমার এত বড় স্পর্ধা ক্ষমার অযোগ্য।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি খুব হাতেপায়ে ধরেছিলাম। কোন লাভ হয়নি। হাতে রামদা ধরিয়ে আমাকে পুলিশে দিয়ে দেওয়া হল। অস্ত্র মামলায় আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হল। ভূমিকম্পের তোড়ে যেন আমার স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মাটিতে মিশে গেল।
বাবা অনেক চেষ্টা করেছিলেন, লাভ হয়নি। ছয়মাস পর ওই নেতার প্রতিপক্ষ দলের হস্তক্ষেপে ছাড়া পেয়েছিলাম। বাবা খুব চেয়েছিলেন- আমি যেন পড়াশোনাটা শেষ করি। আর হয়ে ওঠেনি। মৃত মনে আর সাধ জাগেনি স্বপ্ন গড়ার, হয়ত সাহস হয়নি। হয়তবা আবার স্বপ্ন ভাঙার একটা নীরব ভয় আমার অজান্তেই শক্তিশালী কোন শেকলে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। সেই শেকল ভাঙার গান আমি কোনদিন গাইনি। গাইবার কোন আকুলতা মনটাকে আলোড়িত করেনি।
দিনেদিনে আমি একরকম আবেগ বিসর্জিত মানুষ হয়ে গেলাম। নিজেকে মানুষ বলে দাবি করলেও বাবার দৃষ্টিতে আমি অমানুষ রয়ে গেলাম।
বাবা আমার এই লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়া, বাউণ্ডুলেপনা যেমন মানতে পারেননি, তেমনি মানতে পারেননি আমার রাজনীতিতে জড়িয়ে যাওয়াটা।
স্বপ্নভাঙার কষ্টটা বুকের মাটিতে ঠিক কতটা জখম আঁকতে পারে, তা আমি আমার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে উপলব্ধি করেছিলাম। কষ্ট থেকে ভালো কিছু হয়ত হতে পারত। হয়নি। আমি বখে গেছিলাম। যারা আমাকে ছাড়িয়েছিল, প্রস্তাবটা ওরাই দিয়েছিল। আমায় নেশায় ধরেছিল। প্রতিশোধের নেশা। বাবা অনেক বুঝিয়েছিলেন, কত অনুনয় করেছিলেন- কানের দ্বারে এসে সেসব অনুনয় সব শক্তি হারিয়েছিল। আমি প্রায় উন্মাদের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ঝাঁপ দেবার সময় ভাবিনি ঝাঁপটা কোথায় দিচ্ছি। সাগর ভেবে নোংরা পুকুরের শ্যাওলামাখা পানিতে ডুবেছিলাম। বাবা বহুবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমি উঠে আসিনি। আমিও নোংরা রাজনীতির কাদাজল গায়ে মাখিয়ে বিরোধীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আমার ধারালো বুদ্ধি আর হৃদয়হীন বিরোধী দমন পন্থা আমাকে অল্পদিনেই উচ্চপদের আসন দিয়েছিল। আমি খুশি ছিলাম, খুশি ছিলেন না বাবা-মা আর রুমকি।
নিজের জীবনের এই ভিন্ন গতিপথ নিয়ে কোনদিন আমার মনে কোন আক্ষেপও জন্মায়নি। অথচ আজ এক অপরিচিত অবরাধবোধ আমার উপর সওয়ার হয়েছে। কেবলই মনে হচ্ছে- যদি সেদিন বাবার ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দিতাম তবে আজ হয়ত বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম হত। হয়ত আজ এমন একটা দিন আমাকে দেখতে হত না। আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হত না পরিবারের আহাজারি, আক্ষেপের কান্না। আজ যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়, সারা পৃথিবীর কাছে আমি দোষী হয়ে যাব। নিজের কাছে
আরও বেশি, ক্ষমার অযোগ্য কেউ।
বাবা আমার ভালোটাই চেয়েছিলেন। আমার বুঝতে বড্ড দেরি হল। বুঝাবুঝির ভুলে শেষদিকে বাবা বেশ অধৈর্য হয়ে গেছিলেন। রুমকি মাঝেমাঝে বলত, ‘তোর জন্য বাবা কাঁদে। মায়ের সাথে চিল্লায়। মাকে বলে- ছেলেকে বুঝাও। এখনও সময় আছে। ফিরে আসতে বলো।’
কথাগুলোর আমাকে নাড়াতে পারত না। বাবা আমাকে প্রায় প্রতিদিনই বকতেন। আমার এই এলোমেলো চলাফেরা, সিগারেট খাওয়া, আড্ডাবাজি, রাজনীতি এসব বাবা আর নিতে পারছিলেন না।
শেষমেশ আজ সন্ধ্যায় বাবা একরকম জোর খাটালেন। অগ্নিমূর্তি হয়ে বললেন, ‘মরে গেলেও আমার আফসোস থেকে যাবে- তোকে মানুষ করতে পারলাম না। মানুষ হয়ে মানুষের উপকার করা শেখাতে পারলাম না। নোংরা রাজনীতি থেকে তোকে বাঁচাতে পারলাম না। যদি তুই বুঝতিস আমার কথা! যদি ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনীতির চর্চা প্রতিষ্ঠিত করতিস। আর কোন ছাত্রের জীবন মিথ্যে মামলায় ধ্বংস হতে না দিতিস, সেটা হতো তোর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রতিবাদ। যদি সেই যুদ্ধটার ভার তুই নিতিস আমি বুক ফুলিয়ে রাখতাম। আমি তোর এই ধ্বংস আর মেনে নিতে পারছি না। হয় তুই আমার কথা মেনে নিবি, নয়ত এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।’
আমারও রক্ত ফুটছিল। টগবগিয়ে। রাগের আতিশয্যে আমিও বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি- এটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, যে ভুল তার দন্তনখর থাবা বসিয়েছে বাবার জীবনে।
৫.
প্রায় তিনঘণ্টা হতে চলল। ওটির সামনে অস্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যাচ্ছে। নানারকম দুশ্চিন্তা মনের ভেতর আকুলিবিকুলি করছে। অবশেষে ডাক্তার বের হলেন। আশানিরাশার দোলাচলে দুলতে দুলতে এগিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন, ‘আপনারা মনকে শক্ত করুন। আমাদের চেষ্টা আমরা করেছি। ওনাকে আই সি ইউ তে পাঠানো হচ্ছে। বাকিটা সময়ই বলবে।’
ডাক্তারের কথায় শেষ আশার আলোটুকু লুকোচুরি খেলতে শুরু করল। মনটাকে আর স্থির রাখতে পারলাম না। হাসপাতাল ছেড়ে ফুটপাত নেমে এলাম। হাঁটতে থাকলাম ঘুমন্ত পৃথিবীর ফুটপাত ধরে। উদ্ভ্রান্ত নিস্তেজ এক পথচারী হয়ে।
নিঝুম রাতের বুকে তারারাও আজ মুখ ঢেকে আছে। আমার সাথে যেন তারাদেরও অভিমান। নিজের বিরুদ্ধে নিজের অভিযোগগুলো মনের মধ্যে জমে জমে পাহাড় হতে লাগল। সেই পাহাড়ের কাঁটাবনের আঁচড়ে আমি জখমী হতে হতে নিস্তেজ হতে থাকলাম। নিজেকে নিজে ক্ষমা করার একটা উপযুক্ত কারণ বের করতে পারলাম না। বাবার কাছে ক্ষমা চাইবার সুযোগটাও হলো না।
আমার অপরাধ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দিয়েও মোচিত হবার নয়! অঝোর ধারায় চোখ ধুয়ে বৃষ্টি পড়তে লাগল। কিলবিল করা মনকাচা ময়লারা ঝরে ঝরে পড়ল সে বৃষ্টিতে। ওরাও আজ আমায় নিয়ে উপহাস করছে! উপহাস ওদের রঙে, উপহাস ওদের ঢঙে। এ রঙ রাতের আঁধারের চেয়ে কালো। সে কালোয় ডুবে গেছে আমার সকল শক্তি।
আমার পা দুটো টলছে। ক্লান্তিতে নয়, সন্ত্রস্ততায়। তবুও দাঁড়িয়ে আছি। মাত্র তিন ক্রোশ দূরে দাঁড়ানো কালো কুকুরগুলো চেঁচামেচি শুরু করল। আমার বুকটা ধক করে লাফিয়ে উঠল। দাদীর মুখে শুনেছিলাম- গভীর রাতে কুকুরের চিৎকার অমঙ্গলের লক্ষণ। বিশ্বাস করিনি। কখনও এসব নিয়ে ভাবিওনি। আজ কেন ভাবছি জানি না। আজ নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই। আজ বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে। বড়বড় কথারা ডুব মেরেছে। শুধু ভাবছি তবে কি আমার জন্যেও কোন অমঙ্গল অপেক্ষমাণ? যা ঘটে গেছে তাতে কি অমঙ্গলের ঘাটতি ছিল? আরও কোন অমঙ্গলের সাথে দেখা হবার কি খুব প্রয়োজন আছে?
নিজেকে বেঁধে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর পারছি না। জর্জরিত অসহায় মন যেন মুক্তির খোঁজে পাগলপ্রায়।
চারিদিকের পৃথিবীটা দুলছে। একরকম বাধ্য হয়ে ফুটপাতে বসে পড়লাম। রাতের গায়ের রঙ আর মনের রঙ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অন্ধকার আকাশের বিশাল শূন্যতা আর আমার মনের শূন্যতা যেন যমজ।
বিচলিত হৃদয়ে জলঘোলা চোখে খোলা আকাশপানে চাইলাম। সেই নির্বাক চাহুনি আকাশ ভেদ করে মহাশূন্য ছাড়িয়ে গেল। শূন্যের ওপারে যিনি বসে আছেন তাকে বললাম, ‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও, প্লিজ। আমি বড় কষ্টে আছি। এই যে দেখো আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেছি। আমি কাঁদছি। খুব কাঁদছি।
সেই ছোট্টবেলায় যখন মন খারাপ হত বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমাকে তার বুকে টেনে নিতেন। আজ আমাকে সান্ত্বনা দেবার কেউ নেই। বুকের শূন্যতা শীতল করার জন্য আমার কোন আশ্রয় নেই। তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি আর কখনো তার অবাধ্য হব না। কথা দিচ্ছি, আবার বাবার হাত ধরে ভোরের দূর্বাঘাসে পা ছোঁয়াব। নদীর তীরে সাদা কাশফুলের বুকে পাশাপাশি বসে পাল্লা দিয়ে ছবি আঁকব। একসাথে বসে ভাত খাব। বাবা যা বলবে তাই শুনব। আবার বাবার লক্ষ্মী ছেলে হব। শুধু তাকে ফিরিয়ে দাও, প্রভু। একবার ফিরিয়ে দাও।’
কেউ একজন কাঁধে হাত রাখল। উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলাম। মামা বললেন, ‘তোর বাবার জ্ঞান ফিরেছে।’ পৃথিবী প্রাপ্তির আনন্দে আমি স্তব্ধ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এরপর আমি আবারও ছুটছি। বাবার কাছে ছুটছি, এক অন্য মানুষ হয়ে। এ আমার অন্যরকম প্রত্যাবর্তন, অনন্য প্রত্যাবর্তন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *