পাঞ্জাবি

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্বোধ লোকটা দার্শনিক হয়ে গেল। ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই নাকি জ্ঞানীর কাজ। অথচ তাকে যখনই সেই ভবিষ্যৎ বিষয়েই প্রশ্ন করা হত নির্ভার অচিন্ত্য ভঙ্গিতে বলে দিতেন, ‘মুইলো যখন মুটা হয় তকন মাটি আপনাআপনিই সইরি যায়, একলাই জাগা হইয়ি যায়’। নয় ভাই-বোন। বোনদের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু চারটে ভাইয়ের? তাদের তো বাস করতে হবে। জায়গা বলতে ওই ভিটের পাঁচ কাঠা জমি। ওতে চারজন দূরের কথা দুজনেরই ঘর, হেঁসেল, খোঁয়াড়-গোয়ালঘর হবে না ঠিকমতো! বাবার কাছে সে প্রসঙ্গ তুললেই তিনি একগাল হেসে মুলার থিওরি শুনিয়ে দিতেন। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতোই লাগত কথাগুলো সেলিমের কাছে। ভাইবোনদের মধ্যে সেই হয়েছে সবচেয়ে ব্যতিক্রম। পরিবারের ভালোমন্দ, ভবিষ্যৎ এইসব বিষয়ে গ্রাহ্য না করে বড় ভাইদের মতন সে চিন্তামুক্ত, উদ্বেগহীন দিন কাটাতে পারে না; ছোট হলেও। কেরোসিন অভাবে সন্ধ্যাবাতি বিহীন ঘর, জ্যোৎস্নার আলোয় দু’চার নলা ঝাল-নুন কিংবা শাকপাতা মাখা ভাত মুখে পুরে আধপেট খেয়েই রাত পার। কখনোসখনো শুধু রাত নয়, পরদিন অর্ধেক বেলাও ওতেই কেটে যাওয়া। সেলাই করতে করতে সুচ-সুতো দিয়ে একমাথার সাথে আরেক মাথা গাঁথারও শক্ত জায়গা অবশিষ্ট থাকতো না! বহুদিনের পুরনো উপরন্তু সেলাইয়ে সেলাইয়ে দুর্বল হয়ে যেত জামাপ্যান্ট। সাধ-আহ্লাদ তাদের জন্য না বয়স কম হলেও বাস্তবতা বুঝিয়ে দিয়েছিল। খালেকের আব্বা বছর পেরিয়েছে বিদেশ গেছে। গাঁয়ে মাঝেমাঝে গুঞ্জন ওঠে সে বুঝি নতুন সংসার পেতেছে। না হলে বউ -বাচ্চা রেখে এতদিন কেউ নিরুদ্দেশ থাকে? কচিমন বিবি বৃদ্ধ মানুষ। বয়স কত হবে কাগজেকলমে পাকা হিসেব না পাওয়া গেলেও, নব্বইয়ের এপারে নয় গ্রামের প্রবীণজন সকলের একই কথা। বয়সের ভারে বৃদ্ধার দেহ ন্যুব্জ। হাঁপানির বেরামও আছে। বছর গড়িয়েছে, ছেলে নিখোঁজ! শেষ বয়সে পরপারের কিনারায় দাঁড়িয়ে ওরকম একটা ধকল সামলে নেওয়ার শক্তি সময় কোনোটাই থাকে না! রোজই যায়যায় অবস্থা। আল্লাহ’র নাম কানে দেয়। কান্নাকাটির শোরগোল ওঠে, খানিকক্ষণ বাদে থেমেও যায়। এর আগেও যে তার এমন সংকটাপন্ন অবস্থা হয়নি তা নয়। ঐ রকম মরমর অবস্থা হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মেয়েরা ছুটে এসেছে কান্নাকাটিও করেছে, সেবাযতœ, ঔষধ পথ্যে বুড়ি কদিন বাদে বেশ খড়খড়ে হয়ে উঠেছে। আগের মতো দাওয়া-তে বসে পান চিবোই। নাতী-নাতনীদের গল্প শোনায়। পুরনো অভ্যাসের ন্যায় বাড়িতে কেউ ঢুকলেই, ‘কিডা গো তুমি? কিডা? ঠাউর করতি পারনুনি তো! কাছে আইগু আইসো’। চোখে ঠিকমতো দেখতে পেত না। দূরের মানুষ একদমই চিনতো না। কাছে এগিয়ে গেলে চেনার পর, রাজ্যের খোঁজখবর; প্রশ্ন। তুমার ওমুকের তমুক কেমন আছে। তুমার বাপকে, চাচাকে, ফুপুকে ওমুককে তমুককে আসতি বলবা। আমি কোলে করে মানুষ করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি। খালেক দেশে ফিরেছে। দেশে বলতে নিজের বাড়িতে ফিরেছে। পাঁচ-দশ গ্রাম খুঁজে হাতে গোনা দু’চারজন আট-দশ ক্লাস লেখাপড়া জানা সেই ডাকবাক্সের যুগে জেলা বা বিভাগ পেরুলেই বিদেশ যাত্রা ধরা হতো। দেশের সীমানা অতিক্রমকে তাহলে কী বলা হতো? এইসব অঁজপাড়া গাঁয়ের লোকেরা কী আর ভূগোল বোঝে? না গ্লোব বোঝে! পৃথিবীতে নিজের দেশের বাইরে তারা কেবল বুঝতো দেশ আছে হাতে গোনা মোটে দু’টো তিনটে। তবে সার্বজনীন জানামতে দেশ কেবল দুটো। সেই সাতসমুদ্র তের নদী পারের দেশ। তাদের ভাষায়- সাদা ধবল মানুষের ‘বিলাত’ আর ‘আমরিকা’। এই তো সেদিন খেদিয়ে দিল সেইসব বিলাতের শ্বেতি সাহেব-বিবিদের।
দিন বিশেক পরেই ঈদ। খালেক নাকি বাড়ি আসতোই। কিন্তু সেদিন দিনমজুর বিক্রির হাটে পাশের গ্রামের কলিম শেখের ছেলের সাথে দেখা হয়েই জানতে পেরেছে মা জননীকে সীমানা ঘেঁষে রেখে জীবন-মৃত্যু দড়ি টানাটানির প্রতিযোগিতায় নেমেছে! একপক্ষের কিঞ্চিত শক্তি বেশি খাটলেই পলক পড়তে সময় নেবে না! তিনবেলা খাওয়া মাসে দেড়শ টাকা কাজটাও কঠিন না, গোরুমোষ চরানো মূলত রাখালী। সেজন্য সুবিধে মতো কাজ পাওয়ায় বাড়ি আসে নি। ছাড়লেই দখল। বাড়িতে যে একেবারে খবর পাঠায় নি তাও নয়। তিন গ্রাম পরের গ্রাম ছিরামপুরের একজনের কাছে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিল বাড়িতে দিতে এবং খবর পাঠাতে। পটল বংশের হাড়ুর বড় বউয়ের ছেলে পঁচাকে দিয়েও খবর পাঠিয়েছিল। কিন্তু বাড়িতে খবর পৌঁছায়নি। কষ্টে ক্ষোভে খালেকের বুক ফেঁটে যায়। তাই সে কোনোরকম কোনো ভাবনাচিন্তা শঙ্কা না করে ছুঁটে আসে সেই বেহেস্তী মুখখানার তৃষ্ণায়। মা ডাক ডেকে বুক জুড়োতে। সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। খালেকের গেরস্থ বেশ ভালো মানুষ। মায়ের অসুখ শুনে টাকা পয়সা আর বাঁধিয়ে রাখেনি। শ্রাবণ মাসে দশ দিন কাজ করেছিল সেজন্য চল্লিশ টাকাও দিয়েছেন। কচিমন বিবিও বেশ ভালো। আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও সত্যি। তার কোনো সাড়াশব্দই ছিল না অথচ যেদিন খালেক আসলো, এসেই মা, মা ডাকতে ডাকতে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল কাছে। সকলে মায়ের মুখে পানি দিতে বললে তিনি বাচ্চার দুধ খাওয়ানো ঝিনুকে মুখে পানি দিতেই ঢোকটা গিলে নিল কচিমন বিবি। এরপর থেকে অবস্থার আর অবনতি হয় নি। দুলাল লাল হাফ প্যান্টখানা পরে সারা পাড়া দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। সাথে এটাও বলতে ভুল হচ্ছে না, ‘আব্বা এইডা বিদ্যাশ থেইকা নিয়া আনছে আমার জন্যি। আর খালি প্যান খানাই না, ইর লগে নাল রোংয়ের একটা পাঞ্জাবিও আনছে।’ সেই সম্ভবত খেলার সাথীদের মধ্যে একমাত্র ছেলে যে ঈদে পাঞ্জাবি পরে ঈদগাহে নামাজ পড়বে। এই নুন আনতে পান্তা ফুরায় ঘরের ছেলেদের ওরকম রেডিমেড শক্ত কডের প্যান্ট পাঞ্জাবি বিশাল কিছু পাওয়া। কারণ তারা সর্বদা পুরোনো জামা দিয়েই ঈদ করে। নতুন জুটলেও তা সিট কাপড়ের একটা জামা বা প্যান্ট। তবে ওদের কাছে ওটা ‘প্যান’। কারণ তাদের কাছে ‘প্যান’ আর ‘প্যান্ট’-র মধ্যে বিশাল ফারাক! ছিটকাপড়ে তৈরি ওটা ওদের কাছে ‘প্যান’ আর কেনা ওটা ‘প্যান্ট’, এদের মতো সচরাচর কারোরই জোটে না! কিন্তু এবার যেটা দুলালের হয়েছে অর্থাৎ প্যান্ট। সাথে পাঞ্জাবিও। দুলালের ডিমান্ড যথেষ্ট বেড়েছে। বন্ধুরা সকলেই সাধছে।


চুরি করে পাড়া ভাগের থেকে এক্সট্রা এই ফল, ওই ফল, দুটো কাচের গুটি সবই দিচ্ছে কেবল একবার লাল টকটকে পাঞ্জাবিটা দেখার জন্য। কিন্তু দুলালেরও এক পণ ঈদের আগে সে কাউকে পাঞ্জাবি দেখাতে রাজি নয় পুরাতন হয়ে যাবে। প্যান্টটাই দেখাতো না। কেবল দেখিয়েছে নমুনা স্বরূপ, নয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না বলে। সেলিম দুলালের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সেও সেধেছে দেখার জন্য। ওকে অন্তত দেখাতে পারত। কিন্তু না, তাকেও দেখায় নি। সেলিম বাড়ি এসে পিড়ির ওপর বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে। এই সময় অন্যদিন চেঁচিয়ে গলা চিরে মলেও তার হদিস মেলা দায়! আর আজ আপনাআপনি বাড়ি এলে তাও বসে চুপচাপ। মা ডেকে বলল, ‘সেলিম কিরে কিছু খাবি? খিদে পেয়েছে বুঝি?’ কোনো প্রত্যুত্তর নেই। ঠাই বসে। এবার মা কাছে এসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে, ‘কিরে সেলিম চুপকরে বসে আছিস যে? কেউ কিছু বলেছে?’ সেলিম মায়ের হাতটা ঝ্যাঁটকা মেরে ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো, ‘সবার আব্বা ভালো শুধু আমার আব্বা ছাড়া! আমার আব্বা দুনিয়ার সবচাইতে খারাপ আব্বা! দরকার নাই ওরাম আব্বার আমার!’ যেই ছেলেটা সব বোঝে নীরবে মেনে নেয় তার এমন আচরণে মা হতবিহ্বল হয়ে গেল! -এ কিরাম কতা সেলিম আব্বাকে নি এইসব কী বুলছিস তুই? আব্বা কত কষ্ট করে তোরে জন্যিই তো! – যে আব্বা একটা পাঞ্জাবি দিতি পারে না সে কী আব্বা! সেলিম এগুলো বলে আর ফুঁপিয়ে কাঁদে! নিরক্ষর হলেও বাঙালি নারীর স্বামীর প্রতি আলাদা ভক্তি ও সম্মানের জায়গা ছিল। রাগে ছেলের প্রতি গায়ে হাত তুলতে গেলে দূর থেকে রমিজ মিয়া বারণ করে। কাছে এসে বলে ‘ও তো ঠিকই বলছে কুলসুম! আমি তো অক্ষম বাপ-ই!’ পুরুষ মানুষের চোখের জল সহজে দেখা যায় না। অথচ সেদিন রমিজ মিয়া অঝোরে কেঁদেছিল সাথে কুলসুমও! ঈদে পথশিশুদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ চলছে। ‘স্যার, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? আজ পাঁচ বছর আপনার কাছে আছি। তাই কৌতূহল জন্মেছে। প্রতিবছর কেন লাল পাঞ্জাবিই আপনি বিতরণ করেন? স্পেশাল অর্ডার করেন?’ সবচেয়ে শক্ত গম্ভীর মানুষটি আজ উত্তর দিলেন, ‘মাটি সরে গেছে আপনাআপনি। মুলার জায়গা হয়ে গেছে। চল্লিশ বছর আগের সেই নির্বোধ লোকটি যে সত্যিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ছিলেন বুঝতে পেরেছি তাই!’ অতঃপর সেলিম চিৎকার করে বললেন, ‘বাবা, শুনছো তুমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তুমিই শ্রেষ্ঠ দূরদর্শী মনীষী!’

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *