কাসীদায়ে শাহ নিয়ামাতুল্লাহ কাশ্মীরী রহ.

কবিতার রচনা, রচনাকাল এবং অনুবাদ প্রসঙ্গে
শাহ নিয়ামাতুল্লাহ (রহ.) নামে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন এগারো শতাব্দীর দিকে। তাঁর কাসীদায় (মূলত এটি কাব্যগ্রন্থ) তিনি প্রায় ৫৮টি ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫৮টি ভবিষ্যৎ বাণীর মধ্যে প্রায় ৩৬টি সত্যে রূপান্তর হয়েছে। এভাবে সত্যে রূপান্তর হওয়ার কারণ মূলত দুটি হতে পারেÑ ১) তিনি রাসূলুল্লাস স.-এর হাদীসের সহায়তা নিয়েছেন, ২) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে ইলহাম বা জ্ঞান। জানা গেছে, ব্রিটিশ লর্ড কার্জনের শাসনামলে (১৮৯৯-১৯০৫) এই কবিতাটির প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও বাংলা ভাষায় প্রথম এই কবিতাটি রূহুল আমীন খান অনুবাদ করেছিলেন ১৯৭০/৭১ এর দিকে। এ ছাড়া কবিতাটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত কাসীদায়ে সাওগাত এবং মদিনা পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ‘মুসলিম পুনঃজাগরণ প্রসঙ্গ ইমাম মাহদী’ বইতেও পাওয়া যাবে। তো কী আছে কবিতাটিতে? আসুন কিছু অংশ জেনে নিই যেগুলো ইতোমধ্যে বর্তমান সময়ের সাথে মিলে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও মিলে যাওয়ার ঘোরতর সম্ভাবনা আছে। আল্লাহু আ’লাম।

’৪৭-এর দেশভাগ প্রসঙ্গ
২২ নম্বর প্যারায় বলেছেন, ভারত ভাঙ্গিয়া হইবে দু’ভাগ শঠতায় নেতাদের মহাদুর্ভোগ দুর্দশা হবে দু’দেশেরি মানুষের (চিন্তা করুন, ১১৫৮ সালে বসে ১৯৪৭ এর দেশ ভাগ নিয়ে বলেছেন)।এরপর দেশভাগের পর এই অঞ্চলের কী হাল হবে, তিনি তা বলেছেন ২৩-৩৬ প্যারায়। সেখানে তৎকালীন মুসলিম নেতাদের দুর্নীতি, অশ্লীলতায় ডুবে যাওয়া, সামগ্রিকভাবে পুরো জাতির অধঃপতনে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারগুলো এনেছেন, যা হুবহু মিলে গেছে দেশভাগ থেকে এই সময় পর্যন্ত।
ইন্টারেস্টিং প্যারা হচ্ছে ৩৭ থেকে, যেগুলোর মুখোমুখি এখনো আমাদের হতে হয়নি, তবে বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা ভালভাবেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। কী আছে ৩৭ প্যারা থেকে, পড়ুনÑ
(৩৭)
এরপর যাবে ভেগে নারকীরা পাঞ্জাব কেন্দ্রের
ধন সম্পদ আসিবে তাদের দখলে মুমিনদের।
টীকা ১ = এখানে পাঞ্জাব কেন্দ্রের বলতে কাশ্মীর মনে করা হয়।
টীকা ২ = হাদিসে বর্ণিত গাযওয়ায়ে হিন্দ বা হিন্দুস্তানের যুদ্ধের পূর্বে মুসলিমরা সর্বপ্রথম ভারতের কাছ থেকে একটি এলাকা দখল করে নেবে। এটা হতে পারে পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মির এলাকাটা।
(৩৮)
অনুরূপ হবে পতন একটি শহর মুমিনদের
তাহাদের ধনসম্পদ যাবে দখলে হিন্দুদের।
(৩৯)
হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ সেখানে চালাইবে তারা ভারি
ঘরে ঘরে হবে ঘোর কারবালা ক্রন্দন আহাজারি।
টিকা = ৩৮ ও ৩৯ নং প্যারায় বলা হয়েছে, মুসলিমরা যখন কাশ্মির দখল নেবে এর পরই হিন্দুরা মুসলিমদের একটি এলাকা দখলে নেবে এবং সেখানে ব্যাপক হত্যা ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। মুসলমানদের ধন-সম্পদ ভারত সরকার লুটপাটের মাধ্যমে নিয়ে নেবে, মুসলিমদের ঘরে ঘরে কারবালার ন্যায় রূপ ধারণ করবে। ধারণা করা হচ্ছে, যে দেশটা ভারত সরকার দখলে নিয়ে এ ধরনের হত্যা ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশ। অর্থাৎ মুসলমানরা কাশ্মীর জয় করার পর হিন্দুরা বাংলাদেশ দখল করবে।
(৪০)
মুসলিম নেতা-অথচ বন্ধু কাফেরের তলে তলে
মদদ করিবে অরি কে সে এক পাপ চুক্তির ছলে।
(৪১)
প্রথম অক্ষরেখায় থাকিবে শীনে’র অবস্থান
শেষের অক্ষরে থাকিবে নূন’ ও বিরাজমান
ঘটিবে তখন এসব ঘটনা মাঝখানে দু’ঈদের
ধিক্কার দিবে বিশ্বের লোক জালিম হিন্দুদের।
টীকা = এখানে বলা হচ্ছে, সেই উপরে উপরে মুসলিম, কিন্তু তলে তলে গোপন পাপ চুক্তি করবে, সেই নেতার নামের প্রথম অক্ষর হবে ‘শ’ এবং শেষের অক্ষর ‘ন’। আর তিনি ঘটনা ঘটাবেন দুই ঈদের মাঝে। যেটা হতে পারে সামনের কোনো ঈদ বা দুই তিন বছরের মধ্যে। কিন্তু হিন্দুদের সাথে তার গোপন কার্যকলাপ বেশীদিন টিকবে না বলে পরের প্যারাগুলোতে বলা হচ্ছে।
(৪২)
মহরম মাসে হাতিয়ার হাতে পাইবে মুমিনগণ
ঝঞ্বারবেগে করিবে তাহারা পাল্টা আক্রমণ।
(৪৩)
সৃষ্টি হইবে ভারত ব্যাপিয়া প্রচণ্ড আলোড়ন
‘উসমান’ এসে নিবে জেহাদের বজ্র কঠিন পণ।
(৪৪)
‘সাহেবে কিরান-‘হাবীবুল্লাহ’ হাতে নিয়ে শমসের
খোদায়ী মদদে ঝাপিয়ে পড়িবে ময়দানে যুদ্ধের।


টীকা (সাহেবে কিরান) = এখানে মুসলমানদের সেনাপতির কথা বলা হয়েছে। শনি ও বৃহস্পতিগ্রহ অথবা শুক্র ও বৃহস্পতি গ্রহের একই রৈখিক কোণে অবস্থানকালীন সময়ে যে যাতকের জন্ম অথবা এ সময়ে মাতৃগর্ভে যে যাতকের ভ্রুনের সঞ্চার ঘটে তাকে বলা হয় সাহেবে কিরান বা সৌভাগ্যবান। সেই মহান সেনাপতির নাম বা উপাধি হবে ‘হাবীবুল্লাহ’।
(৪৫)
কাঁপিবে মেদিনী সীমান্ত বীর গাজীদের পদভারে
ভারতের পানে আগাইবে তারা মহারণ হুঙ্কারে।
টীকা = আক্রমণকারীরা ভারত উপমহাদেশের হিন্দু দখলকৃত এলাকার বাইরে থাকবে এবং হিন্দু দখলকৃত এলাকা দখল করতে হুঙ্কার দিয়ে এগিয়ে যাবে।
(৪৬)
পঙ্গপালের মত ধেয়ে এসে এসব ‘গাজীয়ে দ্বীন’
যুদ্ধে জিতিয়া বিজয় ঝাণ্ডা করিবেন উড্ডীন।
(৪৭)
মিলে এক সাথে দক্ষিণী ফৌজ ইরানী ও আফগান
বিজয় করিয়া কবজায় পুরা আনিবে হিন্দুস্তান।
টীকা = হিন্দুস্তান সম্পূর্ণরূপে মুসলমানদের দখলে আসবে।
(৪৮)
বরবাদ করে দেয়া হবে ‘দ্বীন-ঈমানের দুশমন’
অঝোর ধারায় হবে আল্লা’র রহমাত বরিষণ।
(৪৯)
দ্বীনের বৈরী আছিল শুরুতে ছয় হরফেতে নাম
প্রথম হরফ ‘গাফ’ সে কবুল করিবে দ্বীন ইসলাম।
টীকা = ছয় অক্ষর বিশিষ্ট একটি নাম যার প্রথম অক্ষরটি হবে ‘গাফ’ এমন এক প্রভাবশালী হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম পক্ষে যোগদান করবেন। তিনি কে তা এখন ধারণা করা যাচ্ছে না।
(৫০)
আল্লা’র খাস রহমাতে হবে মুমিনেরা খোশদিল
হিন্দু রসুম-রেওয়াজ এ ভূমে থাকিবে না এক তিল।
টীকা = ভারত বর্ষে হিন্দু ধর্ম তো দূরের কথা, হিন্দুদের কোন রসম রেওয়াজও থাকবে না ইনশা আল্লাহ্।
(৫১)
ভারতের মত পশ্চিমাদেরও ঘটিবে বিপর্যয়
তৃতীয় বিশ্ব সমর সেখানে ঘটাইবে মহালয়।
টীকা = বর্তমান সময়ে স্পষ্ট সেই তৃতীয় সমরের প্রস্তুতি চলছে। অর্থ্যাৎ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে মুসলমাদের বিরুদ্ধে কাফিররা যুদ্ধ করছে তথা জুলুম নির্যাতন করছে। এই জুলুম নির্যাতনই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিয়ে একসময় তাদের ধ্বংসের কারণ হবে। এখানে বলা হচ্ছে মহালয় বা কেয়ামত শুরু হবে যাতে পশ্চিমারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
(৫২)
এ রণে হবে ‘আলিফ’ এরূপ পয়মাল মিসমার
মুছে যাবে দেশ, ইতিহাসে শুধু নামটি থাকিবে তার।
টীকা = এ যুদ্ধের কারণে আলিফ (আমেরিকা) এরূপ ধ্বংস হবে যে ইতিহাসে শুধু তার নাম থাকবে, কিন্তু বাস্তবে তার কোন অস্তিত্ব থাকবে না। বর্তমানে মুছে যাওয়ার আগাম বার্তা স্বরূপ দেশটিতে আমরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক মন্দা চরমভাবে দেখা যাচ্ছে।
(৫৩)
যত অপরাধ তিল তিল করে জমেছে খাতায় তার
শাস্তি উহার ভুগতেই হবে নাই নাই নিস্তার
কুদরতী হাতে কঠিন দণ্ড দেয়া হবে তাহাদের
ধরা বুকে শির তুলিয়া নাসারা দাড়াবে না কভু ফের।
টীকা = এখানে স্পষ্ট যিনি এই শাস্তি দিবেন তা হবে কুদরতি হাতে। এই শাস্তির কারণে নাসারা বা খ্রিস্টানরা আর কখনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
(৫৪)
যেই বেঈমান দুনিয়া ধ্বংস করিল আপন কামে
নিপাতিত শেষকালে সে নিজেই জাহান্নামে।
(৫৫)
রহস্যভেদী যে রতন হার গাঁথিলাম আমি তা যে
গায়েবী মদদ লভিতে, আসিবে উস্তাদসম কাজে।
(৫৬)
অতিসত্বর যদি আল্লা’র মদদ পাইতে চাও
তাহার হুকুম তামিলের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দাও।
টীকা = বর্তমানে সমস্ত ফিতনা হতে হিফাজত হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে সমস্ত হারাম কাজ থেকে খাস তওবা করা। সেটা হারাম আমল হোক কিংবা কাফের মুশরিক প্রণীত বিভিন্ন নিয়ম কানুন হোক।
(৫৭)
‘কানা জাহুকার’ প্রকাশ ঘটার সালেই প্রতিশ্র“ত
ইমাম মাহাদি দুনিয়ার বুকে হবেন আবির্ভূত।
(৫৮)
চুপ হয়ে যাও ওহে নেয়ামত এগিও না মোটে আর
ফাঁস করিও না খোদার গায়বী রহস্য-আসরার।
এ কাসিদা বলা করিলাম শেষ ‘কুনতু কানযান’ সালে
অদ্ভুত এই রহস্য গাঁথা ফলিতেছে কালে কালে।
টীকা = ‘কুনুত কানযান সাল’ অর্থাৎ হিজরি সন ৫৪৮ মোতাবেক ১১৫৮ ইংরেজি সাল হচ্ছে এ কাসিদার রচনাকাল। এটা আরবি হরফের নাম অনুযায়ী সাংকেতিক হিসাব।

[ইন্টারনেট দুনিয়ার ‘বিশ্বপরিক্রমা – বিশ্বপরিক্রমা’ নামের একটি ফেসবুক-পেজ থেকে গৃহীত।]

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *