কাশ্মীরের কান্না

‘দিন এছাই নেহি জায়েগা সাব’। চেন্নাইয়ের সেন্ট্রাল স্টেশনে এক কুলি প্রচণ্ড খেদ ক্ষোভ ভরা কণ্ঠে স্যুট-বুট পরা এক ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যে কথাটা বলেই হনহন করে চলে গেলেন। বাক্যটার আওয়াজে ঘাড়টা ঘুরিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম বটে ঘটনাটা কিন্তু কিছুই বুঝলাম না প্রাথমিক অবস্থায়। বুঝলাম ঘটার খানিকটা বাদে। সচরাচর যা হয় আর কী!
‘সেদিন দেখিনু রেলে- কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে!’
না এখানে সা’বটা ঠেলে নিচে ফেলে দেননি। যেটা করেছেন সেটা হলো তার পেটে লাথি মেরেছেন, মানে কুলির ন্যায্য পাওনাটা দেননি। উপরন্তু যা নয় তা বলেছেন। অগত্যা কুলিটা সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করলেন ভদ্রোলোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে!
কী বলেন ভদ্রলোক নয়? বিশ্বাস করুন আমার ঠিক মনে আছে, আমি হলপ করে বলতে পারি উনি মোদীজির স্টাইলে হালের আলোচিত পোশাক ডিমান্ড বহুল, ‘মোদী কোট’-ই পরেছিলেন! পোশাকই তো আসল পরিচয়। আজকাল আবার ভেতরের কদর্য কোনো মানে-টানে রাখে নাকি! ওটা যদি বাচবিচারের বিষয় হয় পড়শিরা তো বেশ সংকটে পড়ে যাবে ভাই।
দাদারা আমাদের ঘোর সংকটে তাদের হস্ত প্রসারিত করে দিয়েছিলেন! সেকথা ঘুণাক্ষরেও ভোলা যায়? তওবা! তওবা! রাম রাম! সেই হিতসাধন হেতু গো-প্রীতি বশত নিজের কষ্টার্জিত পয়সাকড়ি দ্বারা ক্রয়কৃত গোশত খাওয়াইও যদি গলায় ছোরা বসিয়ে প্রাণহরণ করে কোনো মুসলমানের বা আমার আপনার, আমাদের? হ্যাঁ সে সম্ভাবনাও ঢের, কেননা বর্ডারের হাল দেখলেই টের পাওয়া যায় আমরা কতটা ওমুখো তা হোক ইচ্ছায় সেচ্ছায় অহেতুক নিরুপায় হয়ে ব্যাধি বাজার বা বেড়াবার জন্যে। গিয়ে গোশত গ্যাঁড়াকলে আটকে প্রাণ-ধন যদি নেয় গো-প্রেমিক ভ্রাতা দাদারা তবুও স্তুতিবাক্যের নৈবেদ্য বিকোতে বিকোতে বিদায় নেব ধরাধাম হতে! আমরা এতই মান্য নিরীহ দায়বদ্ধ প্রাণী যদিও পিতা ভ্রাতা ভগিনীর বক্ষে চাকু বসিয়ে দেই কুণ্ঠাবোধহীনভাবে!
আমাদের মাহাত্ম্যকথা আজ থাক। আরেকদিন সে হবে। আজ বরং ‘কীর্তির শ্মশান’ হিন্দুস্থানের সম্পর্কে দু’চার কথা হোক। আগেই বলেছি আমরা পরশি ভূখণ্ডের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র। সুতরাং নিজের হৃদয়ার্জিত কিংবা আত্মসম্ভুত বিষয় নয় এটা মোটেও। স্রষ্টা প্রদত্ত চক্ষু এবং বিবেক বলে যে বস্তু, গুণগরিমাপূর্ণ সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবীদের মতে অবশ্য ওটা অস্ত্র, মোসাহেবদের কাছে বস্ত্র; যখনতখন পরা ছাড়া যায় স্বার্থ-আর্থ আদায়ের নিমিত্তে! তা বস্তু কিংবা অস্ত্র যা-ই হোক না কেন কারোর ভেতর নূন্যতম ‘বিবেক’ শব্দটার বিদ্যমানতা থাকলে ছিঃ ছাড়া সাব্বাস দেওয়ার সরষেদানা পরিমাণ সুযোগও নাই তারের ওপারের কারবারে! তাদের এক একটা দুনিয়া কাঁপানো গৌরবে বহবা-টা যখন গ্রহণ করেন আশাও করেন এই মানবসত্তাহীন গর্হিত কার্যকলাপে ছিঃ-টা কেন নয়? পার্টিক্যুলার বিষয় ছাড়া ধর্মের পোশাক পরে কথা বলাটা সমীচীন না। ধর্ম আর মানুষ দুটি শব্দ। শব্দ দুটো হলেও প্রাণ একটি। এক হৃদপিন্ডের জয়েন্ট- জমজ এর মতো। ‘ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম’ বাক্যটা বহুল আলোচিত, ব্যবহৃত, শ্রুত, সত্য। গ্রহণযোগ্যও প্রায় নির্বিশেষে।
বাক্যটাতে মানুষই মুখ্য। সত্যই মানুষ-ই মুখ্য। আমিও মানি ‘ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম’। কিন্তু আমার সাথে এটাও মনে হয় মানুষ ব্যতিরেকে ধর্ম অদৃশ্য, অস্তিত্বশূন্য; আবার ধর্ম ছাড়া মানুষ অনুৎকৃষ্ট অন্তঃসারবিহীন নির্মোক, ফাঁপা, অদরকারি জীব মাত্র! তাহলে এই জয়েন্ট-জমজ সদৃশ অঙ্গাঙ্গী বিষয়টাকে আদালা করতে উন্নতমনা বলে পরিচিত যেই বিশেষ শ্রেণী কেন এতটা বিরামহীন? ‘প্রীতি’ অতি উত্তম এবং অত্যাবশ্যকীয় বসুমাতার জন্য। সেখানে মানব-প্রীতিহীন পশুপক্ষী-প্রীতি কতটা যৌক্তিক? গ্রহণযোগ্য?
সমাদরণীয়? এটা কি ‘জান’ বিসর্জিত ‘জীব’ বাঁচিয়ে রাখতে চাওয়ার মতো ব্যাপার নয়? এরকমটাকে আমার তো কেবল গাভীর প্রেমে আচ্ছন্ন ‘গর্দভ-মূর্তি’-ই মনে হয়! আমার মতো আম-আদমীর কথা থাক। যাঁদের মস্তকে ভর করে পদ্মা গঙ্গা কিংবা গোদাবরী পার হতে হয় তাঁদের কটা কথা পড়েই সেদিন বুঝলাম শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকা ছিল সেই আমলে এখন মূলত ‘শক্তি’ মানেই শোষক!


‘কাশ্মীর ভাগের সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রকে বিদ্রূপ ‘ ভারতের বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি। তাঁদের মতে, ‘জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার এবং তাকে দু’ভাগ করার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তটি গণতন্ত্রকে উপহাস করেছে!’ এবং তাঁরা এটাও বলেছেন এমন একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার কোনো পক্ষের সাথেই আলোচনা করেনি! অর্থাৎ সিঁধ কাটার মতো চুপিচাপি! তাহলে আমার সাধারণ মাথার একটি প্রশ্ন যদি সেটা দেশ এবং ‘ভূ-স্বর্গ’ কাশ্মীর এবং সেখানকার জনগণের জন্য মঙ্গলজনকই হবে তাহলে কেন এই চৌর্যপন্থা অবলম্বন? চুয়াল্লিশ ইঞ্চির ছাতি ফুলিয়ে কেন নয় মোদীজি?
তাঁরা এই অভিমতও প্রদান করেছেন যে, ‘মানবতা লঙ্ঘনকারী সমস্ত বন্দোবস্তগুলি প্রত্যাহার করুক সরকার’। অর্থাৎ মোদী গভর্নমেন্ট গৃহীত কাশ্মীর সম্পর্কিত স্টেপগুলোতে যে আসলেই ‘মানবাধিকার’ রক্ষিত নয়, চরমভাবে লঙ্ঘিত তা খোদ ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মহলই বলছেন! এই যে একটি বৃহৎ সংখ্যক বুদ্বিজীবী কাশ্মীর বিষয়ে বিবৃতি প্রদান করেছেন এবং সাক্ষর দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অমিতাভ ঘোষ, টি এ কৃষ্ণা, অশোক বাজপেয়ী, অমিত চৌধুরী, শশি দেশপাণ্ডে, দালিপ কাউরের মতো উচ্চ নামকরা বুদ্ধিজীবীগণ।
তাঁদের বক্তব্য, ‘ভিন্নমতকেই ভয় সরকারের’। এখন আমার সাধারণ মাথার একটা প্রশ্ন হলো সিংহাসনে আসীন সর্বোচ্চ শাসকশ্রেণি কেন ভয় পাবে? যদি তারা স্বচ্ছ এবং সঠিক থাকে? আর ভয়টা আসলে পায় কখন?
‘ভদ্রলোকী = ভোলবাজি’ ‘ভ’ তে আর কী হয়? ভুল হয়। ভালোও হয়। আর? ভ=ভারতও। ভদ্রলোকী মূলত ভোলবাজি কেন? বলছি, ওয়েট।
আমাদের বাড়ির ক’ বাড়ি পরে একজনের বাড়ি। নাম নিতাই। অবিবাহিত। দাদু বলতাম। ছোট্ট দোচালা ঘর, জনমানবহীন থমথমে বাড়ি। প্রাণী বলতে কেবল নিতাই দাদুই বাকি সবটা জড় আর উদ্ভিদে বাড়ি ভরা।
বৃদ্ধের সঙ্গীহীন একা একা সয়ম কাটানো বিষম দুরূহ হয়ে পড়েছিল শেষকালে। সেজন্যে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দলকে গল্প বলতেন। আসর জমাতেন।
তবে তার সে গল্পের আসর জমতো না যেখানে- সেখানে; নদীর ধারে ছাড়া। বহুদিন বহুবার বহুরকমভাবে কারণ সুধানো হলেও উত্তর সেই একই
শব্দে সেম বাক্যে স্মিতহাস্যে, ‘নাম নিতাই, নদীর ধার ছাড়া জমে না; নিতাই ‘ন’ দিয়ে শুরু নদীও তাই।’ আবার তার মতে সবার বেলায়ই এরকমটা প্রযোজ্য নয়, কিছু কথা কিছু বিষয় কেবল বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে খাটে। ‘ভদ্রলোকী ভোলবাজি’ আদ্যাক্ষর ‘ভ’। আবার ‘ভোল’ ‘ভেক’ ‘ভারতে’র’ও আদ্যাক্ষর হচ্ছে ঐ ‘ভ’! তো হলোটা কী তাতে শুনি? ভ দিয়ে কি আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কোনো শব্দ নাই? একটাই খালি? না তা কেন হবে? ঢের আছে। কেবল নিতাই দাদুর কথা মনে হলো, ‘কিছু কথা কিছু বিষয় কেবল বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে খাটে’।
কাশ্মীরের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করাই ভারতীয় জনতা পার্টি বিশেষভাবে উল্লাসিত, বিধায় ‘উদযাপন’ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় উত্তরপ্রদেশে। জনতা পার্টির এক এমপি বক্তব্যের একাংশে বলেন, কর্মীরা খুবই উত্তেজিত এবং যারা অবিবাহিত তারা তো ওখানে বিয়েও করতে পারবেন। এবার আমাদের কর্মীরা সুন্দরী কাশ্মীরি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন। ফর্সা টুকটুকে মেয়েদের বিয়ে করতে পারবেন। মুসলিম পুরুষদেরও আনন্দ করা উচিত। ওখানে বিয়ে করুন। ফর্সা কাশ্মীরি মেয়েদের। আনন্দ করা উচিত। সবার আনন্দ করা উচিত। সে হোক হিন্দু কি মুসলিম। এ নিয়ে সারাদেশে আনন্দ করা উচিত।’ ভায়া ভাং কতখানি গিলেছিলেন অনুষ্ঠানে উপস্থিতের পূর্বে?
তাহার বাণীর উৎফুল্লের বহর এটাই প্রতীয়মান করে রাম রহিমাকে নির্বিঘœচিত্তে বিয়ে করতে পারে তারাও বরণে সদা প্রস্তুত! এ শুনে ক’বার করে রামনাম জপ করা উচিত ব্রাহ্মণদিগের? আর ঐ বিধানিকের গঙ্গা স্নানে সাফ হবে তো সব? শুদ্ধি হতে কটা ডুব লাগিবে দাদা? সাথে ক’ঢোক চোনা?
তিনি কি ভাং গিলে অজ্ঞানে না সজ্ঞানে বলেছিলেন সে বিষয়ে ঢের সংশয় ছিল! তা দূরীভূত হতেও সময় লাগল না! ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাকে ঐ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ত্যানি জানান, ‘এখন কোনো সমস্যা ছাড়াই যে কেউ কাশ্মীরি নারীদের বিয়ে করতে পারবেন। এটাই সত্য। এটা কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতা।’
সাথে গুরুকেও কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি, ‘মোদীজি আপনি আমাদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। সর্বত্র মানুষ ঢাক বাজিয়ে আনন্দ করছে….।’
এতদিন জানতুম ‘ঘোমটার আড়ালে খোমটার নাচ’! আর এখন? ‘মোদীজি আপনি আমাদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন’! তাদের যুক্তি অথচ জঞ্জাল বোধ হয়। যুক্তি এই যে, এর আগে ওখানে নারীদের ওপর অত্যাচার হত। অনুচ্ছেদের বাতিলে স্বাধীন হল যা নারীদের মঙ্গল। অত্যাচার কেই বা আর সাদরে আমন্ত্রণ জানাই? পুষে রেখে পিষ্ট হতে চায়? সুতরাং এটা হতে রক্ষা পেতে তাদের হৃদয় ব্যাকুল ছিল! কোনো এক দেবদূতকে তারা আহ্বান করছিল।
সন্ন্যাসী পুরুষও আজকাল নারী হৃদয়ের আহ্বান শুনতে পান? যেখানে ধর্মসিদ্ধ পতœীও পতিপ্রেম হতে পরিত্যক্ত! এটা কি সত্যিই কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতা? তাদের চাওয়ার ঈপ্সিত মুক্তি? বিশ্বের সাথে, দেশ, আত্মীয়, আপনজনদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন!
তারা যে জুম্মাও আদায় করতে পারছেন না মসজিদে গিয়ে! স্রষ্টার নৈকট্য লাভে ব্যাকুল সত্তর আশি বছরের, একত্ববাদী পবিত্র সত্তার অনুগত বান্দা জাগতিক বাঁধা-বিধান-নিয়মের অবাধ্য বয়স্ক মানুষটাও যে উপাসনালয়ের পথে যেতে যেতে রক্তাক্ত হচ্ছে! ছোট্ট ছোট্ট হাত-পায়ের অপাপবিদ্ধ প্রাণগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষার ঈদটাকেও যে মাটি করে দিলেন, মা’র অশ্রুভারাক্রান্ত আঁখি, দাদার কাঁটাছেড়া রক্তাক্ত শরীর, বাবার আদর ভোলা দাবানলের মতন বিদ্রোহী মুখাবয়ব, বড় ভাইটারও ঈদ-আনন্দ বিস্মৃত বিমর্ষ বদন! এটাকেই কি বলে স্বাধীনতা? গুলতি কি সে সাধে তাক করে সেনাসদস্যের দিকে? যুদ্ধ, স্বাধীনতা, মুক্তি, জাতি-ধর্মবিদ্বেষ, রক্তের প্রতিশোধ না বোঝা ঐ অবুঝ অবোধ শিশুটি? মনে নেই দুশো বছর? পরাধীনতার জ্বালা? যন্ত্রণা? কতটা হাহাকার? মর্মপীড়া? দুইশো বছরের পড়াধীনতার কষ্ট গ্লানি, রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র মহৎ আত্মাও তাঁদের আকাশসম হৃদয় দিয়ে নাশ করতে পারেনি পশুত্ব তোদের? ধিক্কার! শত ধিক পাষাণপ্রাণ! উন্নত নয় আগে তোরা মানুষ হ!

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *