ঈদে মিলাদুন্নবী সা. করণীয় ও বর্জনীয়

প্রতিবছর রবিউল আউয়াল মাসে প্রিয় নবীর মুবারক জন্ম দিনে মুসলিম বিশ্বে প্রতিটি মু’মীনের অন্তরে ঈমানি প্রেরণায় ধ্বনিত হয় ঈদে মিলাদুন্নবী। ঈদে মিলাদুন্নবী তিন শব্দের সমন্বয়ে গঠিত (ঈদ+মিলাদ+নবী)। মুসলিম মিল্লাতের সুপ্ত সংস্কৃতির বিকাশে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের কার্যক্রম মুমিন জীবনে নবীপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সে দিনকে ঈদ বলা যায়, যে দিন আল্লাহ তা’লার পক্ষ থেকে তার মাখলুক কোনো নিয়ামত প্রাপ্ত হয়। মাখলুকাত আল্লাহর পক্ষ থেকে রাহমাতে আলম হিসেবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পেয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত।
কোরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামদের আ’মাল থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত, দু’জাহানের মুক্তির দিশারি রাহমাতুল্লিল আলামিন রাসুলে আরাবী মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার সোবহে সাদিকের সময় এ পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনের দিন কেবল ঈমানদারদের জন্য নয়, বরং সৃষ্টি জগতের সবার জন্য এক বড় নিয়ামত, আনন্দ ও রহমতের দিন। এজন্য গোটা বিশ্বের ঈমানদার মুসলমানরা শরিয়তসম্মত উপায়ে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করে থাকেন। পবিত্র মিলাদুন্নবী হচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি অকৃত্রিম মহব্বত প্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম। মিলাদুন্নবীর ইতিহাস অতি প্রাচীন। মিলাদুন্নবীর সূচনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন! কোরআন মজিদের সুরা আল ইমরানের ৮১-৮২ নম্বর আয়াতে ওই মিলাদুন্নবী মাহফিলের কথা উল্লেখ রয়েছে। নবীজির সম্মানে এটাই ছিল প্রথম মিলাদ মাহফিল এবং মিলাদ মাহফিলের উদ্যোক্তা ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। সুতরাং মিলাদ মাহফিল হচ্ছে আল্লাহর সুন্নাত বা তরিকা। তাই মিলাদুন্নবী উদযাপনের মাধ্যমে সুন্নতে এলাহী পালন করা হয়! সুন্নত পালনের কারণে আল্লাহর মহব্বত ও দয়া লাভ করা যায়; মহান আল্লাহ তা’লা বলেন, হে রসুল! আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াময়। (আল-ইমরান : ৩১)।
মিলাদুন্নবী মুমীন মুসলমানদের অন্তরে হুব্বে রাসুল বৃদ্ধি করে। যার ভেতর রাসুলের প্রেম নাই, সে মু’মিন হতে পারে না। শুধু বাহ্যিক সুন্নাত পালন রাসুলপ্রেম নয়। বাহ্যিক সুন্নাতের সঙ্গে আন্তরিক ও আত্মিক সম্পর্ক থাকতে হবে এবং এ আত্মিক সম্পর্কের ফলে প্রেমিকের দৃষ্টিতে শুধু প্রেমাস্পদই বিরাজ করবেন।
মিলাদুন্নবী পালনের ফজিলত:
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে হাজার আল-হায়তামী আল মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (৯০৯-৯৭৪ হি:) তাঁর ‘আন্নি’মাতুল কুবরা আলাল আ’লম’ গ্রন্থে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত ও তাৎপর্যের কথা তুলে ধরেছেন।
(ক): হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্যে একটি দেরহাম ব্যয় করবে সে বেহেশতে আমার সাথী হবে।
(খ): হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান করল, সে যেন ইসলামকে জিন্দা করল।
(গ): হযরত ওসমান জিন্নুরাইন রাদিয়াল্লাহু বলেন, যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য একটি দিরহাম খরচ করবে সে যেনো বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল। (সুবহানাল্লাহ)।
(ঘ): হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যে ব্যক্তি মিলাদ শরীফের সম্মান করবে তার মৃত্যু ঈমানের সাথে হবে, এবং সে বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে।
(ঙ): আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতি ও আল্লামা হাফিজ আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দাহইয়ার মিলাদুন্নবীর ফজিলত সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাদের কিতাবে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু আমের আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুর অত্যন্ত মহব্বতের সাথে মিলাদুন্নবী পালনের ঘটনা উল্লেখ করেন। হাদিস: হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে মদিনাবাসী আবু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহুর গৃহে গমন করে দেখতে পেলাম তিনি তার সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে একত্রিত করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র মিলাদ শরীফের বিবরণী শিক্ষা দিচ্ছেন এবং বলেছেন যে, আজই সেই পবিত্র জন্ম দিন। এই মাহফিল দেখে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশি হয়ে তাকে সুসংবাদ দিলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা তোমার জন্যে মিলাদের কারণে রহমতের অসংখ্য দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাগণ তোমাদের সকলেরই জন্যে মাগফিরাত কামনা করেছেন।


(চ): ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, যে ব্যক্তি মিলাদ মাহফিলে ভাই- বন্ধুদের একত্রিত করবে, খানাপিনার ব্যবস্থা করবে, উত্তম আমল করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাকে নবী, শহীদ ও সালেহগণের সাথে হাশর নসীব করবেন এবং সে জান্নাতুল নাঈমে বাস করবে।
(ছ): ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহিমাহুল্লাহ্ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যে ঘরে, মসজিদে কিংবা মহল্লায় মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান করা হয়, আল্লাহর ফেরেশতাগণ সে ঘর, মসজিদ, ও মহল্লার লোকদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন।
আল্লাহপাক মাখলুকাতের কল্যাণার্থে অসংখ্য ‘নিয়ামত ও রহমত’ প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ ‘নিয়ামত ও রহমত’ হচ্ছেন প্রিয় নবী রাসুলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আর এই নিয়ামত ও রহমত পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। তবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হতে হবে কোরআন সুন্নাহ তথা শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে।
আল্লাহ তা’লা ইরশাদ করেন: অর্থাৎ আপনি বলুন, ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়ার কারণে তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। তা তাদের সব ধনদৌলত অপেক্ষা শ্রেয়; (১০:৫৮)।
ঈদে মিলাদুন্নবীতে করণীয়:
(ক) এই দিনে রোজা রাখা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সোমবার রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এই দিনে আমি শুভাগমন করেছি, আমি নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি এবং এদিনই আমার প্রতি প্রথম ওহি (কোরআন) অবতীর্ণ করা হয়েছে। (মুসলিম শরিফ, খণ্ড-১)।
(খ): আল্লামা মোল্লা আলী কারী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, শরিয়ত অনুমোদিত সব ধরনের বৈধ কাজ যথা: বিভিন্ন ওজিফার খতম, কোরআন তেলাওয়াত, উচ্চ আওয়াজে না’ত বা আবৃত্তি এবং উন্নত ভোজসামগ্রী তথা তাবাররুকাতের ব্যবস্থা করা।
(গ): এই দিনে ওয়াজ মাহফিল, আলোচনা সভা, সেমিনারের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মকালীন আলৌকিক ঘটনা, (সিরাত) জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা।
(ঘ): শুকরিয়া প্রকাশে, বেশি বেশি নফল ইবাদত, দান-সদকা করা, দরুদ শরিফ পাঠ উন্নত বস্ত্র পরিধান ও র‌্যালি (জসনে জুলুস) ইত্যাদি করা।
এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ ধর্মীয় দিবসের তাৎপর্য ও প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবনে এবং নবী আদর্শের যথার্থ অনুসরণ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে একটি আদর্শ শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে সক্ষম হবে। শরিয়ত অনুমোদিত বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির প্রকৃত ইতিহাস জানার ও সংরক্ষণের সুযোগ পাবে। এভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। আর যদি আমরা এসব স্মরণীয় ঐতিহাসিক দিবসকে ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ না করি, তাহলে একদিন ক্রমান্বয়ে বিস্মৃতির অতলগহ্বরে তলিয়ে যাবে এবং অনাগত ভবিষ্যৎ বংশধররা একদিন বেমালুম ভুলে গিয়ে পথভ্রষ্ট হবে।
ঈদে মিলাদুন্নবীতে বর্জনীয় কাজ:
(ক): মিলাদুন্নবী মাহফিলের নামে নারী পুরুষ, যুবক-যুবতী একত্র হয়ে নাচ-গান-বাজনা ও গান গাওয়া।
(খ): বিধর্মীদের মতো আতশবাজি করা।
(গ): শরিয়ত অনুমোদিত নয় এমন সব গর্হিত কাজ করা।
উপসংহার:
ইমাম বদরুদ্দিন আইনি বুখারী শরীফের ব্যাখ্যায় লিখেন: হজরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন , ‘আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে দেখি; সে আমাকে বলে ভাই আব্বাস আমার মৃত্যুর পর থেকে কবরের জিন্দেগীতে আমি শান্তিতে নেই! কিন্তু প্রতি সোমবার এলেই আমার শাস্তি লাগব করে দেওয়া হয়; (সুবহানাল্লাহ)।
শাস্তি লাগবের কারণ হিসেবে হজরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন আবু লাহাব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম (মিলাদ) উপলক্ষে খুশি হয়ে হজরত সুয়াইবা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আজাদ করে ছিলেন। এখন কথা হলো আবু লাহাবের মত জঘন্য কাফের যদি নবীজির মিলাদে খুশি প্রকাশ করার কারণে সপ্তাহে প্রতি সোমবার জাহান্নামের আজাব থেকে একটু প্রশান্তি পায়, তাহলে যারা মু’মিন মুসলমান তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিলাদ শরীফ খুশি মনে পালন করলে কি জান্নাত পেতে পারেনা বা নাজাত পেতে পারেনা? এই কথার সুন্দর সমাধান দিয়েছেন শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ্, তিনি বলেন : যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (জন্ম) মিলাদ শরীফকে সম্মান ও তাজিম করবে এবং খুশি মনে পালন করবে সে চির শান্তির জায়গা জান্নাতের অধিকারী হবে ।

তথ্যসূত্র

  • আন্নি’মাতুল কুবরা আলাল আ’লম।
  • সাবিল আল হুদা আলা শরহে কাতরুন নাদা ওয়া বাল্লুস-সাদা।
  • আত-তানভীর ফি মাওলিদ আল বাশির আন-নাযির।
  • ওয়াসায়েল ফি শরহে শামায়েল।
  • আল মাওরেদুর রাভী।
  • ফাতহুল বারি সরহে সহীহুল বুখারী।
  • মা-ছাবাতা বিস সুন্নাহ ১ম খণ্ড

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *