ইশকে রাসুলে স্নাত হতে চাই

রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিলাদতের তারিখ নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও আমরা ১২ তারিখকে প্রাধান্য দিই। তবে মাস নিয়ে কারো মাঝে কোন মতানৈক্য নেই। আর তা হলো, পবিত্র মাহে রবিউল আওয়াল। এ মাস যখন মুমীন আশিকের দ্বারে হাজির হয়, মুমীনের দেহের সৌন্দর্য যেমন বেড়ে যায়; সৌরভে ভরে ওঠে দিলের এ জমিন; তেমনি বেড়ে যায় মুমীনের ভাষার শান। দরুদে-সালামে জিহ্বার রস- তা হয়ে ওঠে বড়ই লাজ্জাতের। বারে বারে মনে পড়ে নবীজীর কথা। স্মৃতির আয়নায় ভাসে মদীনার ছবি। যখনই দেখি সবুজের গম্বুজ, বিরহরা নড়ে চড়ে ওঠে- ব্যকুল হয়ে যায় মন, কবে যেতে পারবো মদীনায় বার বার ভেসে ওঠে এই কথা এই সুর-
নদী তুমি কোন মোহনায় চলছো নিরবধি
একটু দাড়াও তোমার কাছে করছি মিনতি।
তোমার স্রোতের সাথে আমায় যাও নিয়ে সুদূরে
যেন ঐ মদীনার বন্দরে মোর তরীটা ভীড়ে
(আশিক কাঁদে দীদার পেতে)
মদীনার পানে মুমীনের চাহনি বার বার ফিরে চায়। যে নবীর জন্য এই তামাম জাহান; যে নবীর উছিলায় মিলবে তামাম উম্মতের শাফায়াত; সেই নবী ঘুমিয়ে আছে সোনার মাদীনায়। যেদিন থেকে তিনি মদীনার মাটিতে শায়িত হলেন, সেদিন থেকেই আল্লাহর কাছে রোনাজারীর মাধ্যমে তামাম উম্মতের বাসনা শুরু হয়ে গেলো-
হে প্রভূ! হৃদয়ের এবং জিসমের সকল প্রকার
সংকীর্ণতা থেকে আমাকে মুক্তি দাও,
তোমার সমস্ত ‘খালক্বের’ যিনি পরম বন্ধু-
সেই নবী মোস্তফা
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উছিলায়…
আর নবীজীর মদীনায় আমাকে দান করো
অবস্থান করার‘একটু’ সৌভাগ্য,
রিজিক দাও- অতুলনীয় নেআমতের
আর নসীব করো
জান্নাতুল বাক্বীতে ‘চির’ শয়নের…
(বিশ্বনবীর আগমনে জাগলো সাড়া)
সত্যিই নবীজীর বিলাদতে আমাদের মাঝে যে পুলক ও দ্যোতনা ছড়িয়ে পড়ে, তাতে মদীনার কথাই বার বার মনে হয়। বাড়ির কথা ভাবতে গেলেই মদীনার কথা মনে হয়। মনবলে, মদীনা-ই আমার বাড়ি।
পাখিরা বেলা শেষে নীড়ে ফিরে
আমারও তো নীড় আছে ঐ সুদূরে,
ঐ নীড় মদীনা সেথায় যাবো
না গেলে মদীনায় পথ হারাবো।
নবীজীর উপর যত বার দরুদ পড়ি, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সায়্যিদিনা মাওলানা মুহাম্মাদ… যত বারই সালাম দিই, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ… হৃদয়ের তখন চাওয়া থাকে, নবীজীর কদমে হাজির হতে; কিন্তু মদীনা হায় কত দূর-
মদীনা আর কত দূর বিরহে প্রাণ বিধুর
মদীনায় নাও ডেকে নাও শাহে মদীনা
বলবো আমি হৃদয় খুলে সকল বেদনা।
(আশিক কাঁদে দীদার পেতে)
এ মাস যখন মুমীন আশিকের দ্বারে হাজির হয়, মুমীনের দেহের সৌন্দর্য যেমন বেড়ে যায়; সৌরভে ভরে ওঠে দিলের এ জমিন; তেমনি বেড়ে যায় মুমীনের ভাষার শান।
“নবীজীর স্মরণে আমার ভাষার শান বেড়ে গিয়েছে…
কোন প্রকার প্রস্তুতি-আয়োজন ব্যতিরেকেই দিলের জজবারা ঢেউ তুলতে শুরু করেছে…
আর কবিতার পংক্তিমালারা নবীজীর অনুরাগে গভীর সমুদ্রের জোয়ারে যাত্রা শুরু করেছে…


আমি যতই-নবী মুহাম্মাদের প্রশংসা করি আমার ছন্দময় কথা দ্বারা,
আসলে সত্যিই, আমি নবী মুহাম্মাদেরই প্রশংসা করি আমারই ছন্দময় কথা দ্বারা…
(আমি বিশ্বাস করি), আমার সর্দার ‘আহমদ’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মরণ করাতে আমার জিহ্বার ও ভাষার শান বেড়ে গিয়েছে…
আবার তাঁকে স্মরণ করার ফলে মনে ও দেহে এতো তৃপ্তি এসেছে যে, সকল উৎকণ্ঠা দূর হয়ে গিয়েছে, সহজেই আমরা নবীজীর দেখানো পথ পেয়ে গিয়েছি…”
(খুঁজে ফিরি হৃদয়ের সুখ)
দরুদে-সালামে জিহ্বার রস- তা হয়ে ওঠে বড়ই লাজ্জাতের। ‘মুহাম্মাদ’ ‘আহমাদ’ ‘হাবীবুল্লাহ’Ñকি মধুর নাম! এ নাম উচ্চারণেই দিলের পাড়ে ঠিকরে পড়ে একটা রোশনী-
যতন করে জপছি আমি তোমার নাম
কি যে মধু ঝরছে সেথায় অবিরাম।
দরুদ পড়ি সালাম পাঠাই তোমার চরণে
আমায় তুমি ধন্য করো তব দরশনে।
(খুঁজে ফিরি হৃদয়ের সুখ)
এই পয়েন্টে এসে মরহুম কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই কবিতার লাইনটা আরো সুধাময়-
মুহাম্মাদ নাম যতই জপি ততই মধুর লাগে…

কিছু জরুরী কথা
অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, ভালোবাসতেই হবে পিয়ারা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। কেননা তাতে রয়েছে মুক্তি। কিন্তু এ ভালোবাসাতে হবে সবার চেয়ে বেশি, সবচে পরিপূর্ণ, সর্ব উত্তম, সকলের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, অতুলনীয় বা কারো সাথে ভালোবাসার তুলনা ছাড়াই।
তবে কথা হলো, ভালোবাসার মূল অর্থ মাজনুন বা পাগল হয়ে যাওয়া বা বেকারার হয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বা শুধু এটাকে ভালোবাসা বলা চলে না। আসল অর্থ কুরআনে বলে দেয়া হয়েছে- ফাত্তাবিউনীÑতোমরা আমার অনুসরণ করো। কি অনুসরণ করবে? অপর আয়াত, উসওয়াতুন হাসানাতুন বা আল্লাহর রাসুলের উত্তম সুন্দর আদর্শ।
এর জন্য প্রয়োজন আল্লাহর রাসুলকে জানা। যে ব্যক্তি পিয়ারা নবী কে যত বেশী যত গভীরভাবে চিনতে পারবে, তার পক্ষে নবীজীর ইত্তেবা ও ভালোবাসার মুরাকাবায় মগ্ন থাকা সহজ হবে। বর্তমানে ভণ্ডামীর নামে ইশকে রাসুল শিরোনামে এতোটাই বাড়াবাড়ি করা হয়, যাকে পরিভাষায় চরমতম নিন্দিত ঘৃণিত বিদআত আখ্যা দেওয়া যায়। অনেক সময় শরীয়তের সীমানাকেও হার মানায়। ওয়াজে নসীহতে বানোয়াট কাহিনী বলা, হাদীসের নামে রাসুলুল্লাহকে মিথ্যার তোহমত দেওয়া, গজলে বা কবিতায় কাল্পনিক রূপ এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা যা অবান্তর, জশনে জুলুসের নামে এমন এমন কর্ম প্রকাশ পায় যা শরীয়তের বিচারে হারামের মানদণ্ডেও পড়ে যায়; যেমন- অর্থ অপচয়, লোক দেখানো, বাজনা বা তবলা বাজানো, গাড়ি-ঘোড়া ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা ইত্যাদি, যা সবই গোনাহের কাজ। তবে জশনেজুলুস বা র‌্যালীর মাধ্যমে খুশী প্রকাশ কেউ যদি করতে চায়, তাহলে ইশকে রাসুলের মাপকাঠি অনুযায়ী করতে হবে। কোনভাবেই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। আমাদের সিলসিলায়ে ফুরফুরা শরীফে এ নীতি নেই, না থাকলেও সিলেটের ফুলতলী দরবারের বাংলাদেশ আনজুমানে তালামিযে ইসলামিয়ার উদ্যোগে যে বিশাল র‌্যালি বের হয়, সেটা খুবই সাবলীলভাবে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু জায়গায় যেভাবে বা অনর্থক অনেক কিছু খরচ করে র‌্যালি বের করা হয়, সেটার প্রতিবাদ করা সকলের জরুরী। তবে অনেক স্থানেই শান্তিপূর্ণভাবে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। আল্লাহু আলামু।
আল্লাহর মাহবুব বান্দাগণ ইশকে রাসুলকে কোন সাধারণ বা সহজ বিষয় ভাবতেন না, তারা এটা সাধনা করে অর্জন করতেন। কিন্তু পাঠক! আপনি ভাবুন তো, আমরা কতটা সহজ মনেকরি ইশকে রাসুলটাকে…
আল্লাহ তাআলা আমাদের যেন সাইয়েদ আহমাদ শহীদ বেরলভী রহিমাহুল্লাহুর নেক নজরে সিক্ত করেন এবং রসুলনোমা সূফীফতেহআলী ওয়াইসী রহিমাহুল্লাহুর ওছিলায় আমাদেরকে আশিকে রাসুল হিসেবে কবুল করেন। আমিন ছুম্মা আমিন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *