শাহ-সূফী বংশোদ্ভূত নিভৃতচারী এক ওলীআল্লাহ হযরত বালাউটি ছাহেব র.

ইলমে তাসাওউফ সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার সৌভাগ্য যাদের হয় তাঁরা হলেন ওলীআল্লাহ। ইলমে তাসাওউফ ব্যাপক আলোচনা সাপেক্ষ বিষয়। সারকথা-মানুষ নিজের অন্তর চক্ষু দিয়ে মহান আল্লাহর সঠিক পরিচয় অনুধাবন করতে পারে। আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের অন্যতম উৎকৃষ্ট মাধ্যম হলো ইলমে তাসাওউফ। ইলমে তাসাওউফের নক্ষত্রতুল্য এক খাদিম হলেন হযরত আল্লামা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব র.। তিনি বালাউটি ছাহেব ও বালাউটি হুজুর নামে সর্বমহলে খ্যাত। তিনি শাহ-সূফী বংশোদ্ভূত নিভৃতচারী এক ওলীআল্লাহ ছিলেন। নানা গুণী ও মুত্তাকীগণ তাকে নানা অভিধায় নানা উপমায় আখ্যায়িত করেন। কেউ বলেন- তিনি ছিলেন একজন কুতবে জামান। কারো উপমায় তিনি একজন ফেরেশতাতুল্য মাটির মানুষ। সব অভিধার মোদ্দাকথা হলো – আল্লামা বালাউটি ছাহেব র. ছিলেন মুত্তাকী-পরহেজগার আল্লাহর মায়ার বান্দা। তাঁর তরিকতের প্রথম মুর্শিদ ছিলেন- উপমহাদেশের বিখ্যাত ওলী শাহ-সূফী হযরত আল্লামা ইয়াকুব বদরপুরী র.। কুতবে যামান হযরত বদরপুরী র.-এর তিরোধানের পর একটি অলৌকিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে বায়য়াত গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন আয়নায়ে জামালে আহমদী, মুর্শিদে বরহক, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর নিকট। কিংবদন্তীতুল্য দুই আধ্যাত্মিক সম্রাটের স্নেহধন্য বালাউটি ছাহেব র. ইলমে তাসাওউফ জগতে পরিপুষ্টতা লাভ করেন।
শাহ-সুফী, দরবেশ বংশে শুভাগমন করা ওলী আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর উর্ধতন পুরুষগণ দিল্লির অধিবাসী ছিলেন। সেখান থেকে শাহ-সূফী মংলা র. এবং শাহ-সূফী আব্দুল আজিজ র. সিলেটের খাদিম মহল্লায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁরা জকিগঞ্জের বালাউটে আসেন। শাহ-সূফী মংলা (র) বালাউটে স্থায়ীভাবে থেকে যান। অপরজন ভারতের শিলচরে গিয়ে দ্বীনি খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। বর্তমানে সেখানে তাঁর মাজার ‘ছাত্তাচূড়ার মোকাম’ নামে পরিচিত।
আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিক জীবন তথা জীবনের সকল পর্যায়েই এক মহান আদর্শের প্রতিকৃতি। তাঁর আদর্শের অনুসারী হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মুরিদীন-মুহিব্বিন তথা জাতি, ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ে স্বতন্ত্র আসন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। তাঁর বহুমুখী খেদমতের আলোচনা করা সামান্য পরিসরে সম্ভব নয়। এখানে অতি সংক্ষেপে তাঁর একটু পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র।
সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্যঃ-
প্রিন্সিপাল আল্লামা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি। পিতা-মরহুম মো. রছমান আলী, মাতা-মোছাম্মাত জয়নব বিবি। তিনি ১৯৪৩ ইংরেজি সালের ১৫ই মে সিলেট জেলাধীন জকিগঞ্জ উপজেলাস্থ ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের বালাউট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৩ভাই ৩বোনের মধ্যে দ্বিতীয় অধ্যক্ষ আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন পিতামাতার কাছে। মক্তব শেষ করে ১৯৪৭ইং সালে সড়কের বাজার আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৪৯ ইং সালে বাড়ির নিকটস্থ হাড়িকান্দি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর ইছামতি দারুল উলূম কামিল (এম.এ) মাদরাসা থেকে ১৯৫৬ ইং সালে দাখিল এবং ১৯৫৮ ইং সালে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উক্ত মাদরাসা থেকে ১৯৬০ ইং সালে ফাজিল পাশ করে ভর্তি হন সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসায় এবং ১৯৬২ ইং সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে কামিল উত্তীর্ণ হন।
তিনি ১৯৬০ইং সালে বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ.) মাদরাসায় খন্ডকালীন সহকারী শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬২ইং সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানেই প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করে কর্মজীবনের সূচনা ঘটিয়ে ১৯৭৫ইং সাল পর্যন্ত দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। ১৯৭৬ইং সাল থেকে ১৯৮২ইং সাল পর্যন্ত আটগ্রাম আমজদিয়া মাদরাসায় প্রধান শিক্ষকের পদে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮২ইং সাল থেকে জালালপুর জালালিয়া কামিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ইং সালে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ কর্মবীর ১৯৯০ইং সালে সিলেট জেলা শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং ১৯৯৩ইং সালে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমীতে (নায়েম) প্রশিক্ষণ প্রাপ্তি অন্ত ‘শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ’ সম্মানে ভূষিত হন। পারিবারিক জীবনে ১১পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জনক তিনি। এক পুত্র এবং এক কন্যা মারা গেছেন। অন্যান্য পুত্র সন্তানদের ৩জন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যান্যদের মধ্যে ১জন ডাক্তার, ১জন কোরআনে হাফিজ এবং অন্যরা শিক্ষার্জনে রত রয়েছেন।
আল্লামা বালাউটি ছাহেব র. স্বীয় পীর ও মুর্শিদ, সুলতানুল আরেফিন আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর কাছ থেকে ১৩৮৭ হিজরী সনে ইলমে কেরাত এবং ১৯৭১ইং সালে তরিকত বা ইলমে তাসাওউফের সনদ লাভ করেন। আল্লামা বালাউটি ছাহেব র. ৩রা অক্টোবর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ , বৃহস্পতিবার বেলা ৩ টা ৪০ মিনিটের সময় সিলেটের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ৪অক্টোবর শুক্রবার লাখো মানুষের উপস্থিতিতে নামাজের জানাযা শেষে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বালাউটস্থ ‘বালাউট দারুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরাসা’র সামনে দাফন করা হয়।
আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত খানেকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেদমত তাকে করেছে মহিমান্বিত। তাঁর অসংখ্য শাগরিদ দেশ-বিদেশে উচ্চ পর্যায়ের চাকুরীতে নিয়োজিত থেকে সুনাম কুড়াচ্ছেন। তিনি আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। হাদীস শরীফের দারস, তাফসির বয়ান ও ছালিক-তালেবগণকে তালিম দেয়ার সময় আরবি, উর্দু বা ফার্সি শব্দের যথাযথ বাংলা অর্থটি বলতেন। কখনো সঠিক অর্থ মনে না পড়লে সেটির মর্মার্থ না বলে পরবর্তীতে বলবেন বলে সেটি রেখে দিতেন। সব কাজে পরহেজগারিকে প্রাধান্য দিতেন। সুন্নতে নববীর পুরোপুরি পাবন্দ বালাউটি ছাহেব র. মোসতাহাব আদায়েও অভ্যস্ত ছিলেন।
তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর বাগ্মিতা এবং সমাজ ও দেশ হিতৈষী কর্মকাণ্ড তাকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা। তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনের প্রক্ষাপটে ইসলামি জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দান করে অভিভাবকের সম্মান লাভ করেছেন।
হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর কাছে আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর বায়আত হওয়ার অলৌকিক ঘটনাটি তাঁর নিজের ভাষায় নিম্নরূপ-
“আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর দরবারে বায়আতের পূর্বে আমি পীরানে পীর কুতবুল আউলিয়া হযরত আল্লামা শাহ ইয়াকুব বদরপুরী র.-এর কাছে বায়আত ছিলাম। বদরপুরী ছাহেব র.-এর ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বের একটি ঘটনা আমার অন্তঃচক্ষু খুলে দেয়। এ ঘটনাটি হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর অন্যতম কারামত। এ ঘটনা দ্বারা তিনি যে আল্লাহর একজন কামিল ওলী এ বিষয়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়। ঘটনাটি হচ্ছেঃ আমি মাধ্যমিক শিক্ষা বেশি সংখ্যক গায়ের মসলকী আসাতাযায়ে কিরামের কাছে হাসিল করার কারণে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর প্রতি আমার বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। দেওয়ানচক গ্রামে লজিং থাকাকালে সে গ্রামের মসজিদের ইমাম মরহুম মাওলানা আবদুছ ছবুর সাহেব রামাদ্বান শরীফে একাকী ইতিকাফে বসতে সম্মত না হওয়ায় গ্রামবাসীর অনুরোধে আমিও তাঁর সাথে ইতিকাফে শামিল হই। একদিন সকালে আমি ‘নূরুল আনওয়ার’ কিতাব পড়ছি এবং তিনি কুরআন শরীফ পড়ছেন, এমতাবস্থায় কথা প্রসঙ্গে তিনি ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর কথা উল্লেখ করলে আমি বললাম, উনি একজন বেদাতী পীর সাব, উনার কথা এখানে আলোচনা করা ঠিক নয়। তিনি অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হয়ে আর্তনাদের সুরে বললেন, আরে আরে উনার কথা এভাবে বলো না, তিনি একজন কামিল ওলী। উল্লেখ্য, ইমাম ছাহেবও হযরত বদরপুরী র.-এর মুরীদ ছিলেন।


এভাবে কথোপকথনের এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ অকল্পিতভাবে আমরা দু‘জন ঘুমিয়ে পড়ি। অথচ আমার কিতাব এবং তাঁর কুরআন শরীফ তখনো খোলা অবস্থায় ছিল। এটা ঘুম নাকি অজ্ঞান হওয়া ছিল আমরা দু‘জনের কেউই বুঝতে পারিনি। আমি স্বপ্নে দেখলাম, একটি অনাবাদী বাড়ির পুকুরপাড়ে হাত-ছাড়া একটি নতুন চেয়ারে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র. উত্তরমুখী হয়ে বসে আছেন। তাঁর সামনে একটি মাটির স্তুপ। আমার ধারণা হচ্ছে স্তুপের নীচে একটি কূপ আছে এবং হযরত বদরপুরী র. সেই কূপের ভেতরে ইবলিসকে বন্দী করে রেখেছেন, আর ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র. কে এর প্রহরী হিসেবে বসিয়ে রেখেছেন। আমি দেখলাম, কিছুক্ষণ পর পর বন্দী ইবলিসটি মাথা উঠাতে চেষ্টা করলে মাটির স্তুপটিও উপরের দিকে উঠে যায়। তখন ফুলতলী ছাহেব র. তাঁর চেয়ারের পাশে রক্ষিত কিছু ঢিলা হাতে নিয়ে কুরআন শরীফের একটি আয়াত তিলাওয়াত করা অবস্থায় ইবলিসের উপর ঢিলা নিক্ষেপের জন্য হাত উঁচু করার সাথে সাথে ইবলিসটি মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে যায়। মনে হলো কুরআন শরীফের আয়াতটি ছাহেব কিবলাহ র.-এর মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে অথচ আওয়াজটি যেন আসমান থেকে আসছে। আর উক্ত আসমানী আওয়াজটি আমার হৃদয়ে এমনভাবে আঘাত করছে যে, আমার মন গলে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আর আমি শব্দ করে কাঁদছি। স্বপ্ন দেখার ঠিক সেই মুহুর্তে ইমাম সাহেব আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে জাগ্রত করে বললেন, এইতো এতো ভালোভাবে কথা বললেন, হঠাৎ কী হলো এতো শব্দ করে কাঁদছেন কেন? উঠে দেখি আমার চোখের পানিতে মসজিদের চাটাই ভিজে মাটির কিছু অংশও ভিজে গেছে।
উক্ত ঘটনার কিছুদিন পর হযরত বদরপুরী র. ইন্তেকাল করলেন। তাঁকে দাফনের পরের দিন উপস্থিত কিছু মুজায ও মুতাআল্লিকীন বদরপুরী র.-এর খাস কামরায় বৈঠকে বসেন। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর প্রস্তাবে সবাই একত্রিত থাকার জন্য বদরপুরী ছাহেব র.-এর বড় ছাহেবজাদা আল্লামা মাহমুদুর রহমান ছাহেব র.-এর হাতে উপস্থিত সবাই বাইয়াত হই। এই সময় মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া স্বপ্নের ঘটনাটি আমার মনে বার বার উদিত হচ্ছিল। হঠাৎ ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র.-এর নযর আমার উপর পড়ল। আমাকে কাছে ডেকে বললেন-‘তুমি আল্লাহ আল্লায় লেগে যাও।’ মুরশিদ কিবলাহ র.-এর নেক নযর ও সংস্পর্শ লাভ করা আমার জীবনে আল্লাহ তা‘আলার এক মহা নিয়ামত।”
আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-কে তাঁর মুর্শিদ আলাদা চোখে দেখতেন যার অনেক ঘটনা রয়েছে। তন্মধ্যে একটি ঘটনা হলো এরূপ-
একদা আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ র. শাগরিদগণকে নিয়ে নির্জনবাস বা চিল্লাতে যাওয়ার প্রাক্ষালে বয়সে ছোট ‘বালাউটি ছাহেব’র.-কে সাথে নিয়ে সবার সাথে নির্জনবাসে রাখবেন দেখে বয়োজ্যেষ্ঠ কয়েক শাগরিদ ছাহেব কিবলাহ র.-এর কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন- ‘ছাব, এই কচি বাচ্চা এই বয়সে চিল্লা দেয়া সহ্য করতে হয়তো পারবে না। তাঁর ব্যাপারে আমরা চিন্তিত।’ ফুলতলী ছাহেব র. তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে সাথে সাথে বললেন- ‘কাঁচা কলা ধোপ দিলে পাকা হয়ে যায়।’ একথা শুনে শাগরিদগণ আর কিছু বলেননি। ঘটনাটি প্রমাণ করে বালাউটি ছাহেব র. অতি অল্প বয়স থেকে স্বীয় মুর্শিদের নির্দেশে কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনায় লিপ্ত হন এবং প্রাণপ্রিয় মুর্শিদের স্বতন্ত্র মহব্বত লাভ করেন। তাছাড়া মুর্শিদের বাড়ি নিকটে থাকায় বেশী বেশী মুর্শিদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন তিনি। ফলশ্রুতিতে তাসাওউফ জগতে এক অচিন্তনীয় উৎকর্ষতা ঘটে বালাউটি ছাহেবের জীবনে। ওলায়াত জীবনে আল্লামা বালাউটি ছাহেব র. নিজেকে নিভৃতে রাখতে বেশী সচেষ্ট থাকতেন।
কারামতঃ-
আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর কাছ থেকে অসংখ্য কারামত বা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মশহুর কারামতগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞজনের মন্তব্য হলো- পানির বাদশাহ হিসেবে পরিচিত হযরত খিযির আ.-এর সাথে বালাউটি ছাহেবের একটা অলৌকিক তায়াল্লুক ছিল। একথা বলার সুস্পষ্ট যুক্তি হলো-
‘নদীতে পানির স্রোতে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারীর নিখোঁজ লাশ বালাউটি ছাহেবের তদবিরে খোঁজে পাওয়া, গভীর নলকূপ বা টিউবওয়েল বসিয়ে পাতালের পাথরে মূল পাইপ আটকে যাওয়া এবং অনেক জায়গায় পাইপ বসানোর পর বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ার প্রেক্ষাপটে অনেক দূর থেকে বালাউটি ছাহেবের বাতানো স্থানে নলকূপ বা টিউবওয়েল বসিয়ে কাঙ্ক্ষিত পানি পাওয়া, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়াতে ফল-ফসল বিনষ্ট বা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর দ্বারস্থ হয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করার প্রায় ১৫ মিনিটের পরেই প্রচন্ড রোদ সরে বৃষ্টি চলে আসা, আটগ্রামে একটি জানাযার নামাজের পূর্বে প্রচন্ড রোদে মুসল্লিগণ ঈদগাহে দাঁড়াতে পারছিলেন না; তখন মুসল্লিগণের অনুরোধে বালাউটি ছাহেব দোয়া করায় কিছুক্ষণের মধ্যে মেঘমালা এসে ছায়া প্রদান, জলাশয়ে বা ফিশারিতে মাছ চাষ করে তাঁর তদবিরে কাঙ্ক্ষিত লাভবান হওয়া, অজ্ঞাতসারে অনেক পুরনো কবরের উপর রাস্তা করায় পথচারীদের বা কবরের উপর বসতঘর তৈরি করায় বাড়ির বাসিন্দাদের লেগে থাকা অসুস্থতা বালাউটি ছাহেবের অলৌকিক কবর শনাক্তের পর সবার আরোগ্য লাভ, গভীর জঙ্গলে নির্জনবাস বা চিল্লাতে হোজরা বা মাটির গর্তে থাকাকালীন চারপাশে বিচরণশীল বিষাক্ত সাপ, জোঁক, আটালপোকা, পিপিলিকা ইত্যাদি প্রাণীর নানা উপদ্রব থাকলেও তাকে আক্রমণ না করা, অতিশয় উন্মাদ লোককে লোহার লংগর বা বেড়ি দিয়ে বেঁধে বালাউটি ছাহেবের সামনে আনার সাথে সাথে উন্মাদনা থামিয়ে শান্ত হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে পুরোপুরি সুস্থতা লাভ করা, জিনে আছর করা রোগীকে বালাউটি ছাহেবের নাম নিয়ে ফুঁক দিয়ে সুস্থ করে তুলা ছাড়াও এধরণের অসংখ্য কারামতের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘটেছে। যা হযরত খিযির আ.-এর সাথে আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর তায়াল্লুকের প্রমাণ বহন করে। তাছাড়া ৪অক্টোবর জানাযার দিনের ঘটনাবলীকেও অনেক বিজ্ঞ-মুত্তাকি ব্যক্তি বালাউটি ছাহেবের কারামত বলে উল্লেখ করছেন।
কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় সে ঘটনাগুলো উল্লেখ করা সম্ভব হচ্ছে না। আল্লামা বালাউটি ছাহেব র.-এর মতো পূতপবিত্র নিখুঁত মুত্তাকী মুমিনের জীবন আলোচনা করা যেমন দূরহ তেমনি ভয়ের ব্যাপার। তাছাড়া সংক্ষিপ্ত কলেবরে আলোচনা বিন্দুর মতোই। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তরিকতের এ মহান বুজুর্গের দরজা বুলন্দি এবং আমাদেরকে তাঁর ফয়েজ দানের প্রার্থনা জানাই আল্লাহর দরবারে।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *