মিল্লাতে ইবরাহিম : আমাদের পিতার স্মৃতি, স্বপ্ন এবং উত্তরাধিকার

পরম করুণাময় স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে কিছু মানুষকে স্বীয় বন্ধু বলে গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে একজন হচ্ছেন আমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। নবী নূহ (আ.)-এর তিরোধানের প্রায় ২০০০ বছর পর ইরাকের ব্যবিলন শহরে জন্মগ্রহণ করেন ইবরাহিম। সে সময় ব্যবিলন শহরে কলেডিয় জাতি বসবাস করত, যাদের নেতা ছিলেন নমরূদ। বহু-ইশ্বরবাদী সমাজে জন্মগ্রহণ করা ইবরাহিম বাল্য বয়সেই স্বীয় হৃদয়পটে একত্ববাদের প্রণোদনা লক্ষ্য করেছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা’আলা ইবরাহিমের অন্তরে সত্য সমাবেত করেছিলেন এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ৪০ বছর বয়সে রিসালাতের দায়িত্ব পেয়ে ইবরাহিম নিজ গোত্রকে তাওহীদের পথে আহ্বান করলেন। খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিলেন একত্ববাদের সারবস্তু। বললেন- ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁকে ভয় করো। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে কেবল প্রতিমার পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহর নিকট রিযিক তালাশ করো। তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তাঁর নিকটে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে” [সুরা আনকাবুত : ১৬-১৭]। কিন্তু স্ত্রী সারা এবং ভাতিজা লূত্ব ব্যতীত আর কেউ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিলনা।
এরপর ইবরাহিম স্বীয় পিতা (মতান্তরে চাচা) আযরকে তাওহীদের পথে আহ্বান করলেন। সে আহ্বানের কি মায়াময় ভাষা! কট্টর পৌত্তলিক পিতাকে শুধু ‘পিতা’ না বলে বারবার হে আমার প্রিয় পিতা বলে সম্বোধন করে গেলেন। কিন্তু পিতার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলনা। হাল ছেড়ে না দিয়ে ইবরাহিম পুনরায় তাঁর পিতা ও গোত্রকে দাওয়াত দেয়ার মনস্থ করলেন। এবার নতুন ভঙ্গিতে, ভিন্ন পদ্ধতিতে। ইবরাহিম জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কিসের পূজা করো? তারা বলল, মূর্তির। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মূর্তিগুলো কি তোমাদের আহ্বান শুনে? তারা কি তোমাদের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে? জবাব আসল, না। তবে আমরা এভাবেই আমাদের বাপ-দাদার কাছ থেকে পেয়েছি।” লোকদের মূর্খতাপূর্ণ উত্তরের প্রতুত্তরে ইবরাহিম তাদের সামনে আল্লাহর পরিচয় উন্মোচিত করলেন। বললেন-তারা সবাই (প্রতিমাসমূহ) আমার শত্রু, বিশ্ব পালনকর্তা ব্যতীত। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতপর আমাকে পথপ্রদর্শন করেছেন। যিনি আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন। যখন আমি পীড়িত হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। তিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতপর পুনর্জীবন দান করবেন। আশা করি শেষ বিচারের দিন তিনি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেবেন [সুরা শু’আরা : ৭৭-৮২]। এবারের আহ্বানেও কোনো ফলাফল আসল না। উল্টো পিতা তাঁকে ত্যাজ্য করলেন। ইবরাহিম আবার পদ্ধতি পরিবর্তন করলেন। এবার চাঁদ-তারা-গ্রহ পূজারীদের সাথে বিতর্ক করতে উদ্যত হলেন। রাতের আকাশে তারার ঝলকানি দেখে বললেন, হয়তো তারকা-ই ইশ্বর। কিন্তু সে ঝলকানি দীর্ঘস্থায়ী হলনা। এরপর চাঁদকে দেখে বললেন, হয়তো চাঁদ ইশ্বর। কিন্তু দিনের আলো প্রস্ফুটিত হওয়ার সাথে সাথে সে ইশ্বরও মিইয়ে গেল। মাথার ওপর গনগনে সূর্যকে দেখে বললেন, হয়তো এটি ইশ্বর। কিন্তু গোধূলিতে সে ইশ্বরও পশ্চিমাকাশে ডুবে গেল। মানুষের সামনে সৃষ্টিকুলের সব ডুবন্ত বস্তুকে উপাসনার অযোগ্য প্রমাণ করে ইবরাহিম দ্ব্যর্থহীনভাবে এক আল্লাহর ইলাহিয়্যাত ঘোষণা করলেন-‘আমি আমার মুখমণ্ডলকে ঐ সত্তার দিকে একনিষ্ঠ করছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই’ [সুরা আন’আম : ৭৫-৭৯]।
Note: উপরিউক্ত ঘটনাটি কখন ঘটেছিল, তা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম তাবারী বলেছেন, এটি ইবরাহিমের বাল্যকালের ঘটনা। ইমাম ইবনে কাছীর বলেছেন, উক্ত ঘটনাটি পৌত্তলিকদের সাথে বিতর্কের সময় উপস্থাপন করা একটি অনুপম কৌশল। ইবরাহিম এ কৌশলের দ্বারা পৌত্তলিকদের ভেতরে প্রবেশ করে তাদেরকে অসার প্রমাণ করেছেন।
ঘটনাটি বাল্যকালের হোক কিংবা বিতর্কের সময়ের হোক- এর দ্বারা এটি ধারণা করা ভুল হবে যে, ইবরাহিম ক্ষণিকের জন্য মুশরিক হয়ে গিয়েছিলেন। না, কখনোই না। নবী-রাসূলগণ জন্মগতভাবে মুসলিম এবং নিষ্পাপ। তাঁরা এক মুহূর্তের জন্যও মুশরিক হতে পারেন না। এ ঘটনাটি ছিল উদাহরণের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদ বুঝানোর একটি অনুপম কৌশল।
বারবার দাওয়াত ও বিতর্কের পরও যখন কোনো ফলাফল আসছিল না, তখন ইবরাহিম আবার কৌশল পরিবর্তন করলেন। হাতে-কলমে দেখিয়ে দিতে চাইলেন যে, পৌত্তলিকদের পূজিত প্রতিমা কতো দুর্বল। তিনি পূজাঘরে গিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙ্গে সবচেয়ে বড় মূর্তির কাঁধে কুড়াল রেখে চলে আসলেন। জিজ্ঞেস করলে বললেন, ‘যার কাঁধে কুড়াল তাকেই জিজ্ঞেস করো।’ ফলাফলস্বরূপ তাঁর শাস্তি হল। প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হলেন ইবরাহিম। কিন্তু আল্লাহর পথে জীবনভর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ইবরাহিমকে আল্লাহ সে আগুন থেকে রক্ষা করলেন।
পৃথিবীর বুকে এক আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে যারা রক্ত-ঘাম এক করেছেন, নবী ইবরাহিম (আ.) তাঁদের পিতা এবং নেতা।

ব্যবিলনে অতিষ্ঠ হয়ে ইবরাহিম কেনানে হিজরত করলেন। কেনানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি মিশরে গমন করেন। মিশরে তাঁকে কঠিন এক পরীক্ষার মুখামুখি হতে হয়। নারীলোলুপ শাসকের হাত থেকে স্ত্রী সারাকে রক্ষা করে ইবরাহিম আবার কেনানে প্রত্যাবর্তন করেন। সাথে নিয়ে আসেন দাসী (পরবর্তীতে স্ত্রী) হাজারকে। হাজারের (প্রচলিত নাম হাজেরা) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন পুত্র ইসমাইল। কয়েক বছর পর বৃদ্ধা সারার গর্ভে জন্ম নেন আরেক পুত্র ইসহাক। ততদিন ইব্রাহিমের বয়স নব্বুই পেরিয়ে গেছে।
আল্লাহর বন্ধু এবং মানবজাতির নেতা হওয়ার পথে আমাদের পিতা ইবরাহিমকে এমন সব পরীক্ষা দিতে হয়েছিল, মানবসন্তান হিসেবে আমরা সেসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথাও চিন্তা করতে পারিনা। স্বয়ং ইবরাহিমের প্রভু আমাদেরকে জানিয়েছেন-‘যখন ইবরাহিমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন। অতপর তিনি সেগুলো পূর্ণ করলেন’ [সুরা বাকারা : ১২৪]।
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক সম্পাদিত পরীক্ষাসমূহ নিম্নরূপ-
১. কট্টর পৌত্তলিক জাতিকে তাওহীদের পথে আহ্বান করার নির্দেশ।
২. গোত্র ও সমাজ কর্তৃক ত্যাজ্য ঘোষিত হওয়া।
৩. বাদশা নমরূদের সাথে বিতর্কে উপনীত হওয়া।
৪. মূর্তি ভাঙ্গার দায়ে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া।
অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় ইবরাহিম একটি বাক্যই উচ্চারণ করছিলেন-‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতো উত্তম তত্ত্বাবধায়ক’ [সুরা আলে ইমরান : ১৭৩]। সাড়ে তিন হাজার বছর পর ইবরাহিমের পুত্র নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদেরকে নিয়ে যখন উহুদের ময়দানে কুরাইশ বাহিনীর তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, তখন তাঁদের কণ্ঠেও উচ্চারিত হচ্ছিল পিতার শিখিয়ে যাওয়া বাণী-
৫. স্ত্রী সারা ও ভাতিজা লূত্বকে সাথে নিয়ে কেনানে হিজরত।
৬. কেনানে প্রাণঘাতী দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়ে মিশরে হিজরত।
৭. মিশরের নারীলোলুপ শাসকের হাত থেকে স্ত্রীকে মুক্ত করার সফল প্রয়াস।
ইবরাহিম যখন ১ম পর্বের পরীক্ষায় উত্তির্ণ হলেন, তখন শুরু হল ২য় পর্বের পরীক্ষা।
১. বয়স যখন ৮০ বছর, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসল- ইবরাহিম, খৎনা করো। মুহূর্ত বিলম্ব না করে আমাদের পিতা নিজেই নিজের খৎনা করলেন। বলা বাহুল্য, প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক [সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইসতি’যান, ৫৯৪০]।
২. এতো দু’আ, এতো আকাঙ্ক্ষার পর যখন বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ দুটি সন্তান দান করলেন, তখন আবার নির্দেশ আসল- ইবরাহিম, পুত্রকে আমার ঘরের পাশে নির্বাসন দিয়ে এসো। অনুগত বান্দা ইবরাহিম স্ত্রী হাজার এবং পুত্র ইসমাইলকে মক্কায় নিয়ে গেলেন এবং কা’বাগৃহের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর পাশে নির্বাসন দিয়ে আসলেন। সে সময় মক্কা ছিল একটি অনাবাদী ভূমি। ফল-ফসল, মানুষজন দূরের কথা; পান করার পানিটুকুও ছিল না। স্ত্রী হাজার প্রশ্ন করলেন- আপনি কি নিজ ইচ্ছায় আমাদেরকে ফেলে যাচ্ছেন, নাকি আল্লাহর ইচ্ছায়? চোখের পানি মুছতে মুছতে ইবরাহিম বললেন- আল্লাহর ইচ্ছায়। ফিরে আসার পথে পিতা ইবরাহিম রাব্বুল আলামিনের সামনে দু’হাত তুলে ধরলেন-‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! যাতে তারা নামায কায়েম করে। তুমি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা খোরাক দান করো, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে’ [সুরা ইবরাহিম : ৩৭]।
সে মহতি ত্যাগের স্মারক হিসেবে আজও জমজমের পানি প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে।
৩. ইবরাহিম স্ত্রী-পুত্রকে দেখার জন্য মাঝেমধ্যে কেনান থেকে মক্কায় যেতেন। ইসমাইল যখন ১৪ বছরের কিশোর, তখন ইবরাহিম স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি পুত্রকে কুরবানি করছেন। নবীদের স্বপ্ন ওহী। ইবরাহিম পুত্রকে স্বপ্নের কথা জানালেন। কালবিলম্ব না করে ইসমাইল জবাব দিলেন- বাবা, আপনার প্রতি যে নির্দেশ এসেছে, তা পালন করুন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে-‘যখন (ইসমাইল) পিতার সাথে চলাফেরা করার মতো বয়সে উপনীত হল, তখন (ইবরাহিম) তাকে বললেন, হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি। এবার বলো তোমার অভিমত কী? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে, আপনি তা কার্যকর করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’ [সুরা সাফফাত : ১০২]।
মানসিক পরীক্ষায় উত্তির্ণ ইবরাহিমকে পুত্র কুরবানি করতে হলনা। আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে ইসমাইলকে রক্ষা করলেন। আমাদের পিতার সনির্বন্ধ ত্যাগের স্মারক হিসেবে আজও আমরা জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করি এবং ১০ই যিলহাজ্জ কুরবানি আদায় করি।
সমস্ত পরীক্ষায় উত্তির্ণ হওয়ার পর মহান রবের পক্ষে থেকে ইবরাহিমের জন্য স্বীকৃতি আসল-‘ আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা বানাবো।’
ইবরাহিম হাত ওঠালেন- প্রভু, আমার বংশধরকেও নেতা বানাও। আল্লাহ জবাব দিলেন- হ্যাঁ, তবে যালিমদের প্রতি আমার অনুগ্রহ নেই [সুরা বাকারা : ১২৪]।
সেদিন থেকেই মিল্লাতে ইবরাহিমের সূচনা হয়েছিল। ইবরাহিম-পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে আগত প্রায় সব নবী-রাসূল এবং অগনিত সংখ্যক শাসক-সেনাপতি, হাকিম-হুকামা ছিলেন নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর বংশধর। স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা’আলা এ বংশকে নেতৃত্বের জন্য নির্বাচিত করেছেন। কুরআনে এসেছে-‘নিশ্চয় আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহিমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে সমস্ত সৃষ্টির ওপর নির্বাচিত করেছেন’ [সুরা আলে ইমরান : ৩৩] কথায় আছে, ক্ষমতা যখন বৃদ্ধি পায়, দায়িত্ব তখন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মানবজাতির নেতা হওয়ামাত্র ইবরাহিমের কাঁধে এসে পড়ল মানবজাতির কিবলাহ নির্মাণ করার গুরুদায়িত্ব। নির্দেশ আসল- ইবরাহিম, পৃথিবীতে আমার গৃহ নির্মাণ করো।
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পুত্র ইসমাইলকে সাথে নিয়ে আল্লাহর ঘর নির্মাণ করলেন। আজ আমরা যে কা’বাগৃহ তাওয়াফ করছি, সেটি আমাদের পিতার স্মৃতির স্মারক। কাজ শেষে যখন মজুরি নেয়ার সময় হল, তখন পিতা ইবরাহিম পুত্রকে সাথে নিয়ে মালিকের দরবারে হাত ওঠালেন- আল্লাহ! এ শহরকে তুমি নিরাপদ রাখো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী, তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রিযিক দান করো। পরওয়ারদিগার! আমাদের পক্ষ থেকে এ শ্রম তুমি কবুল করো। [সুরা বাকারা : ১২৬-১২৭]।
দু’আ কবুল হল, ইবরাহিম সামনে এগুলেন-‘পরওয়ারদিগার! আমাদেরকে তোমার আজ্ঞাবহ করো এবং আমাদের বংশধর থেকে একটি অনুগত দল সৃষ্টি করো। আমাদেরকে হজের রীতিনীতি শিখিয়ে দাও এবং আমাদেরকে ক্ষমা করো। নিশ্চয় তুমি তওবা কবুলকারী, দয়ালু’ [সুরা বাকারা : ১২৮]।
এ দু’আটিও কবুল হল। এ দু’আর ফলাফল হচ্ছেন পরবর্তী লক্ষাধিক নবী-রাসূল। এ দু’আর ফলাফল তখন থেকে আজ, এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত হাজার কোটি মুসলমান। আমরা সবাই আমাদের পিতার দু’আর ফসল।
এবার ইবরাহিম আরেকটু সামনে এগুলেন। এবার যা চাইলেন, তার কোনো তুলনা নেই। পিতা ইবরাহিম তাঁর সন্তানদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উপহারটি দিয়ে গেলেন-‘পরওয়ারদিগার! তাদের মধ্যে থেকে তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করো, যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমি পরাক্রমশালী মহাবিজ্ঞ’ [সুরা বাকারা : ১২৯]।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের এ মহতি দু’আর ফলাফলস্বরূপ বড় পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশ থেকে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার সুবহে সাদিকের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ও আমিনা বিনতে ওয়াহাবের ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আগমন করলেন মানবজাতির মুক্তির মহা সনদ, নবীদের নবী, রাসূলদের রাসূল, সৃষ্টিজগতের প্রতি মহান স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত, সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম। ইরবাদ্ব ইবনে সারিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেছেন-‘আমি আমার পিতা ইবরাহিমের দু’আর ফসল, ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন, যা তিনি দেখেছিলেন।’ [মুসনাদে ইমাম আহমদ, সহীহ ইবনে হিব্বান, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা] একটি জাতি তৈরি হল, তাঁদের জন্য একজন রাসূল প্রেরণের বন্দোবস্ত করা হল, একটি ইবাদতগাহ নির্মিত হল- এবার সে জাতির নাম রাখার পালা। আমাদের পিতা তাঁর সন্তানদের নাম রাখলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা’আলা আমাদেরকে জানিয়েছেন-‘তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাতের ওপর কায়েম থাকো। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান’ [সুরা হাজ্জ্ব : ৭৮]।
শুধু নাম রাখলেই তো হবেনা। সন্তানদেরকে উত্তম শিক্ষাও দিতে হবে। পিতা সেটি করতেও ভুলেননি। আমাদেরকে শিখিয়েছেন-
১. আল্লাহর ওপর শর্তহীনভাবে ভরসা করা
২. বিপদ-আপদে অটল থাকা
৩. যা কিছু চাওয়ার, একমাত্র আল্লাহর কাছে চাওয়া
৪. প্রথমে আল্লাহর জন্য শ্রম দেয়া, পরে মজুরি কামনা করা
৫. খৎনা করা
৬. দাত পরিষ্কার (মিসওয়াক) করা
৭. হাত-পায়ের নখ কাটা
৮. গোফ ছোট করে ছেটে রাখা
৯. পানি দ্বারা শৌচকর্ম করা
১০. পাজামা পরিধান করা
১১. মানুষকে মেহমানদারী করা
১২. তরবারি ব্যবহার করা
১৩. নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, সন্তান-সন্ততি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা।
[সুরা ইবরাহিম : ৩৫-৪১, কাসাসুল আম্বিয়া, মুয়াত্তা ইমাম মালিক] মুসলিম জাতির পিতা এবং মানবজাতির নেতা হিসেবে সব দায়িত্ব সমাধা করার পর পিতা চাইলেন, তাঁর সন্তানদের নিকট তাঁর স্মৃতিটুকু যেন জীবিত থাকে। মালিকের দরবারে হাত ওঠালেন-‘আমাকে পরবর্তীদের কাছে সত্যভাষী করো [সুরা শু’আরা : ৮৪]। অর্থাৎ, পরবর্তী প্রজন্মসমূহ যখন আমার কথা স্মরণ করবে, তখন আমার স্মৃতিকে তাদের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করো’ [তাফসিরে ইবনে কাছীর]।
যে মহান প্রতিপালকের জন্য ইবরাহিম সারাটি জীবন ব্যয় করলেন, সে প্রতিপালকের পক্ষ থেকেও তিনি ফেরত পেয়েছেন যথাযোগ্য উপহার। উদাহরণস্বরূপ- ১. ইবরাহিম পেয়েছেন মহান আল্লাহর বন্ধুত্বের স্বীকৃতি-‘আর, আল্লাহ ইবরাহিমকে পরম বন্ধুরূপে বরণ করেছেন’ [সুরা নিসা : ১২৫]। ২. ইবরাহিম পেয়েছেন আল্লাহর সম্মুখে শর্তহীনভাবে মাথা ঝোঁকানোর স্বীকৃতি-‘যখন (ইবরাহিমকে) তার পালনকর্তা বললেন- নিজেকে সমর্পণ করো। তিনি বললেন- আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম’ [সুরা বাকারা : ১৩১]। ৩. ইবরাহিম পেয়েছেন তাঁর সুমহান চরিত্রের স্বীকৃতি-‘নিঃসন্দেহে ইবরাহিম বড়ই ধৈর্যশীল, কোমলপ্রাণ, আল্লাহমুখী’ [সুরা হুদ : ৭৫]। ৪. ইবরাহিম পেয়েছেন দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণের নিশ্চয়তা-‘আমি তাকে (ইবরাহিমকে) দুনিয়াতে পুরস্কৃত করেছি। এবং আখেরাতে তিনি হবেন সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত’ [সুরা আনকাবুত : ২৭]।
মিল্লাতে ইবরাহিম একটি মহান আন্দোলন, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং যার সিপাহসালার আমাদের নবী সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। মিল্লাতে ইবরাহিম আমাদের পিতার স্মৃতি, স্বপ্ন এবং উত্তরাধিকার। আমাদের প্রতিপালক জানিয়ে দিয়েছেন যে, আহাম্মক ব্যতীত আর কেউ ইবরাহিমের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না [সুরা বাকারা : ১৩০]।
আল্লাহ যেন আমাদেরকে মিল্লাতে ইবরাহিমের ওপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকার তাউফিক দেন এবং এ মিল্লাতের ওপর মৃত্যু দান করেন। আমীন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *