মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচারকার্য

বিচারকাজ ও জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসাকরণ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই সমস্ত বিচারকের বিচারক। ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ কি বিচারকদের সর্বোচ্চ বিচারক নয়?’ বিচার দিনের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে মানুষের মাঝে বিচার ফয়সালার দায়িত্ব দিয়ে কিতাব সহকারে হযরত মুহাম্মদ স. কে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-‘আমি আপনাকে কিতাব সহকারে প্রেরণ করেছি এ জন্য যে, আপনি মানুষের মাঝে সত্যিকার বিচার করবেন, আল্লাহ যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন ঠিক সেভাবে। আর আপনি খিয়ানতকারীদের পক্ষে বাদানুবাদ করতে যাবেন না। সুরা নিসা, আয়াত: ১০৫।
শান্তি ও মুক্তির দূত, সফল রাষ্ট্রনায়ক, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক, মহামানব মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা. বিচার কাজটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনে সঠিক পন্থা অবলম্বন করে তিনি সঠিক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকারী মহান ব্যক্তিত্ব। প্রিয় নবী স. তাঁর ৬৩ বছর হায়াতে এ দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যেই সমাজে শান্তি কায়েমের জন্য উপযুক্ত বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আবার কীভাবে উপযুক্ত বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হয়, হাতে কলমে তা বাতলে গেছেন। তিনি নিজের কারণে কখনো কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি। নিজের কারণে কারো থেকে প্রতিশোধ কখনো নেননি। কেবল জনগণের জন্যই অপরাধীর উপর দণ্ড কার্যকর করেছেন।
জয়নাব বিনতে হারিস না¤œী খাইবারের ইহুদী মহিলা নবীকে হত্যার জন্য ছাগল ভুনা করে বিষ মিশ্রিত করে নবীকে হাদিয়া পাঠিয়েছিল। সাথে সাথে এ বিষের ক্রিয়া তিনি এবং অন্যরা টের পেলেন। সাহাবীরা তরবারি উঁচিয়ে মহিলার দিকে ধেয়ে আসলে নবী স. মহিলাকে রক্ষা করেন। তাকে মাফ করে দেন। তাকে কোন শাস্তি দিলেন না। পরবর্তীতে যখন বিশর ইবনে বারা নামক সাহাবী বিষের ক্রিয়ায় মারা পড়লেন, তখন এ মৃত্যুর বদলে নবী স. সে মহিলাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু এর আগে তিনি নিজের জন্য এ মহিলাকে কোন শাস্তি দিলেন না। অথচ এ সময় নবী স. ছিলেন মদীনা রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কোন প্রেসিডেন্টকে হত্যার জন্য বিষ প্রয়োগ করার পরে, আসামী ধরে আনার পরে, তা স্বীকার করার পরে সে অপরাধী দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রপ্রধানের হাত থেকে বেঁচে আসা এ যুগে কল্পনাও করা যায়কি? সারা জীবন নবী স. এরূপ জনগণের নিরাপত্তার স্বাথে অপরাধীর উপর আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দণ্ড বিধি কার্যকর করেছেন। আর তার নিজেকে হত্যার জন্য হাজার বার যারা চেষ্টা করেছিল বরাবরই তাদের সবাইকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর পক্ষ হতে অহী নাযিলের মাধ্যমে তিনি হত্যাকারীদের চক্রান্তের খবর জানতে পেরেছেন। এ কারণেই তিনি শত্রুর কবল থেকে বারবার মুক্তিলাভ করে পৃথিবীতে দীন প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
সকল প্রকার স্বার্থ, লোভ, স্বজনপ্রীতি, জুলুম, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পৃথিবীতে সঠিক বিচারকার্য প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি। এর দ্বারা যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি একবার হযরত ওমর রা. কে একটি এলাকার বিচারক করে পাঠালেন। তিন বছর পর হযরত ওমর রা. চাকুরী থেকে ইস্তফা চেয়ে বললেন, হে আল্লাহর নবী ঐ জনপদের লোকজন এত ভাল হয়ে গেছেন যে, সুদীর্ঘ তিন বছরে আমার আদালতে কোন মামলা আসেনি।
এখানে আমাদের জানা দরকার যে, কোন প্রক্রিয়ায় তিনি এমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলেন! কি ছিল তার বিচারনীতি! কি কারণে আদালতে কোন মামলাই জমা হতো না। কোন যাদুবলে তিনি মাদীনাকে একটি শান্তিময় রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হলেন? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমরা দেখব যে, নবী স. এর আনীত বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীর তিন ধরনের শাস্তির বিধান ছিল।
প্রথমত : বিভিন্ন ধরনের কাফ্ফারা : এটি এমন শাস্তি যা শরীয়াতের হুকুম আহকামে ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে আল্লাহ নিজে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত : হদ্দ ও কিসাস (বিধিবদ্ধ শাস্তি) : যে অপরাধে আল্লাহর হকের প্রাবাল্য ধরা হয়েছে, তার শাস্তিকে ‘হদ্দ’ আর যে অপরাধে বান্দার হককে বিনষ্ট হওয়াকেই শরীয়তের বিচারে প্রবল ধরা হয়েছে, তার শাস্তিকে ‘কিসাস’ বলে। হদ ও কিসাস ওই সমস্ত শাস্তি যা আল্লাহর কিতাব বা রাসূল সা.-এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এক্ষেত্রে বিচারক বা সরকারের নিজস্ব মতামতের কোনো সুযোগ নেই।


তৃতীয় শাস্তি হচ্ছে- তা’যীর : যেসব অপরাধের শাস্তির কোনো পরিমাণ কুরআন হাদীসে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি বরং বিচারকের বিবেচনার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তাকে তা’যীর বলে। স্থান, কাল ও পরিবেশ বিবেচনা করে অপরাধ দমনের জন্য যেমন ও যতটুকু শাস্তির প্রয়োজন মনে করেন,বিচারক ততটুকুই দিবেন। এক্ষেত্রে সরকার বা বিচারকের নিজস্ব মতামত ও ন্যায় সঙ্গত সুপারিশ আমলে নেয়ার অবকাশ রয়েছে। নবীজীর বিচার ব্যবস্থায় যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে তাতে অপরাধ সংঘটনের কোন সুযোগই থাকে না। যেমন তিনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেন। আর আমরা অপরাধ সংঘটনের সব পথ উন্মুক্ত রেখে বিচার চাই বিচার চাই বলে শ্লোগান দিচ্ছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অপরাধের সম্ভাব্য উৎস ও কারণকেই বিলোপ করে ফেলতেন। যেমন ধরুন অবাধ জেনা-ব্যভিচার যেখানে চলছিল সে রাষ্ট্রে তিনি হিজাব প্রথা বাধ্যতামূলক করে দিলেন। এখন যেখানে বেগানা নর-নারীর বিনা প্রয়োজনে এবং হিজাব ছাড়া দেখা দেয়ারই অবকাশ নেই, সেখানে একটি নারী ধর্ষণের শিকার হবার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি ইনসাফ ভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতেন : অপরাধী এবং যে সমাজের সে অপরাধ করেছে, এ উভয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি রায় ঘোষণা করতেন। তিনি নিজে শক্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও যদি এ চুরি করতো, তাহলে আমি তার হাতও কেটে দিতাম। আবার দেখা গেল, চোর ধরে আনলেও তিনি তাকে কোন দণ্ড দেননি। কারণ, সে ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করেছিল। অন্তত দশ দিরহামের কম পরিমাণ চুরিতে হাত কাটা ইসলাম অনুমোদিত নয়। আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান : ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো সকলের জন্য ইসলাম একই শাস্তির বিধান দেয়। দেশের কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। নবীর আদালতে তার প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
সংশোধনমূলক ব্যবস্থায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। আল্লাহর হক সম্পর্কিত অপরাধের জন্য ইসলাম অপরাধীকে তাওবা করার সুযোগ দেয়। এ জন্য দেখা যায় আল্লাহর হক বিনষ্ট করে যারা নবীর কাছে স্বেচ্ছায় তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন, নবীজী তখন চটজলদি কোন বিচার কায়েম করতেন না। হযরত উমর অপরাধীকে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন, অর্থাৎ, আল্লাহ তো তোমার অপরাধটি গোপন রেখেছিলেন, তুমি যদি নিজের মধ্যে গোপন রাখতে! এ সব হাজার হাদীস থেকে এ কথা ফুটে উঠে যে, নবীর বিচারকার্য এমন ছিল যে, অপরাধীর কোন নিস্তার নেই। তাই সাক্ষী ও মামলার পূর্বে নিজেই তা হালকা করার জন্য নবীর কাছে এসে বহু আসামী স্বেচ্ছায় ধরা দিতো। আবার আল্লাহর আযাব থেকে পরকালে রেহাই পাবার জন্য দুনিয়াতে শাস্তি ভোগ করে নেয়ার জন্য অপরাধী ব্যক্তিই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তো। তাঁকে শাস্তি না দেয়া পর্যন্ত তিনি নবীর দরবার ছাড়তেন না। আমাদের ভাবা উচিৎ, কতখানি ন্যায় বিচার কায়েম হলে সমাজের অবস্থা এরূপ হতে পার!
কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি : অপরাধের ক্ষেত্রভেদে আল্লাহর আইন অনুযায়ী নবীজী বেত্রাঘাত, রজম ও শিরñেদের বিধান দিতেন। এগুলো কঠোর ও কঠিন শাস্তি। এ শাস্তি জনসমক্ষে দেয়া আল্লাহর নির্দেশ। যেন সাধারণ মানুষ শাস্তির কঠোরতা দেখে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এরূপ শাস্তির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যাতে রক্ষিত হয় এবং বিচার যেন বাদী ও বিবাদীর জন্য সহজলভ্য হয় এবং ন্যায়বিচারের সুফল যাতে জনগণ সহজে ভোগ করতে পারে এর জন্য ইসলাম ও প্রিয় নবী স. এর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
-বিচারকের নিকট পৌঁছতে কোন রকমের প্রতিবন্ধকতা না থাকা।
-বাদী-বিবাদী উভয়ের সাথে একই ধরনের আচরণ করা।
-বিচারক মসজিদে বা বাড়িতে কিংবা এমন কোনো স্থানে বসে বিচার করবে যেখানে প্রবেশ করার ব্যাপারে সকলের অনুমতি রয়েছে।
-বিচারক বাদী-বিবাদী কারো নিকট থেকে হাদিয়া-উপহার গ্রহণ করবেন না। মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন, রসূলুল্লাহ স. আমাকে ইয়ামানে প্রেরণকালে বললেন, আমার অনুমতি ব্যতীত কোন বস্তু গ্রহণ করবে না। কারণ তা প্রতারণার শামিল। যে ব্যক্তি প্রতারণা করবে, কিয়ামতের দিন সে অবশ্যই প্রতারণার বস্তুসহ উপস্থিত হবে। এজন্য আমি তোমাকে ডেকেছি।
-বিচারক বাদী-বিবাদী কারো দাওয়াতে অংশগ্রহণ করবেন না।
-বাদী-বিবাদীদেরকে বসানো, তাদের প্রতি মনোযোগ প্রদান, ইশারা কিংবা সংকেতদান অথবা দৃষ্টিদানের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের প্রতি সমতা বজায় রাখা রাসুলুল্লাহ স. এর সুন্নাত।
এরূপ হাজারো নিয়ম-নীতি ন্যায় বিচারের জন্য অপরিহার্য। এটি একটি সুবিশাল আলোচ্য বিষয়। আমাদের তা ভাল করে জেনে নিয়ে কাজ করা উচিৎ। তিনি ঘোষণা দেন-ন্যায়পরায়ণ বিচারক কিয়ামতের দিন আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত হবে।’ -মুসনাদে আহমদ
আল্লাহ আমাদের সবাইকে নবী স. এর বিচারকার্য থেকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে ন্যায় বিচার ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে সমাজ-রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমীন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *