দুরুদ : গুরুত্ব ও মর্যাদা

দুরুদ ফারসী শব্দ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য দো’আ করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা। পরিভাষায়, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর আল্লাহর রহমত কামনা করাকে দুরুদ বলে’। এই দুুরুদের রয়েছে সীমাহীন গুরুত্ব ও অসীম মর্যাদা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দুরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহর ঘোষণা- ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর প্রতি দুরুদ পড় এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর’ -(সুরা আল আহযাব : ৫৬)। প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দুরুদ পাঠের নির্দেশ মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও দুরুদ পাঠে গুরুত্ব দিয়ে বলেন- ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা তোমাদের ঘরসমূহকে কবরস্বরূপ বানাবে না। আর তোমরা আমার কবরকে উৎসবস্থলে পরিণত করো না; বরং আমার উপর দুরুদ পাঠ কর। অবশ্যই তোমাদের দুরুদ আমার নিকট পৌঁছবে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন’-(নাসায়ী)। আমরা যেখানে থাকিনা কেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দুরুদ পাঠ করলে তা রাসুলের দরবারে পৌঁছানো হয়। অন্য হাদীসে দো’আর পুরো সময়ে রাসুলের প্রতি দুরুদ পাঠের উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং দুরুদ পাঠে পাপ মোচনের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, ‘হজরত উবাই ইবনে কাব রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি অধিক পরিমাণ দুরুদ পাঠ করি। অতএব আমি কী পরিমাণ সময় দুরুদ পাঠের জন্য নির্ধারণ করে নেব? জবাবে তিনি বললেন তা তোমার ইচ্ছা। আমি বললাম, তাহলে এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি জবাবে বললেন, তা তোমার ইচ্ছা। তবে যদি আরো বেশী কর, তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি আবার বললাম, তাহলে কী অর্ধেক সময় নির্ধারণ করে নেব? তিনি বললেন, এটা তোমার ইচ্ছা। আর যদি বেশী অধিক কর, তবে তা তোমার জন্য বেশী উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে কী দুই-তৃতীয়াংশ সময় নির্ধারণ করে নেব? তিনি বললেন, তা তোমার ইচ্ছা। তবে এর থেকে যদি বেশী অধিক কর, তবে তা তোমার জন্য মঙ্গলজনক হবে। তখন আমি বললাম, তাহলে পুরো সময়টাই আপনার প্রতি দুরুদ পাঠের জন্য নির্ধারিত করে নেব। তিনি বললেন, তাহলে তোমার প্রত্যাশা পূর্ণ হবে এবং গুণাহসমূহ মার্জনা করা হবে’ -(তিরমিজি)। এ থেকে বুঝা যায় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি অধিক দুরুদ পাঠ বান্দার জন্য কল্যাণকর, মঙ্গলজনক এবং সর্বোত্তম।
দুরুদ পাঠকে গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশ ও উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। সাথে সাথে দুরুদ পাঠ না করার কারণে ব্যক্তিকে কৃপণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, দুরুদ পাঠের সীমাহীন গুরুত্ব রয়েছে। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘হজরত আলী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ঐ ব্যক্তি বড় কৃপণ, যার উপস্থিতিতে আমার নাম উচ্চারণ করা হয়, অথচ সে আমার প্রতি দুরুদ পাঠ করে না’ -(তিরমিজি)। অন্য হাদীসে যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম শুনার পর তাঁর প্রতি দুরুদ পাঠ করেনা, তার নাক ধুলায় মলিন হওয়ার মতো কঠোর বাণী উচ্চারিত হয়েছে। হাদীসের ভাষ্যমতে, ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ঐ ব্যক্তির নাসিকা ধুলামলিন হোক (সে অপমানিত হোক) যার উপস্থিতিতে আমার নাম উচ্চারিত হয়েছে, অথচ সে আমার উপর দুরুদ পাঠ করেনি’ -(তিরমিজি)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়ে এরশাদ করেন- ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা যখন মুআয্যিনকে (আজান দিতে) শুনবে তখন সে যা বলে তোমরাও তা বলবে। তারপর আমার উপর দুরুদ পাঠ করবে। কেননা, যে আমার উপর একবার দুরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন’ -(মুসলীম)। সে হিসেবে বোধগম্য হয় যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দুরুদ পাঠকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তাই, মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিৎ বেশী করে দুরুদ শরীফ পাঠ করা।


দুরুদ পাঠে রয়েছে নানাবিধ ফজিলত ও মর্যাদা। এই মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করলে বলতে হয়, প্রতি মুসলমান নর-নারীর উচিৎ সর্বদা দুরুদ পাঠে মশগুল থাকা। দুরুদ পাঠের মর্যাদার উপর অসংখ্য হাদীস রয়েছে। তন্মধ্যে, দুরুদ পাঠকারী কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খুবই নিকটে থাকবে। হাদীস শরীফে এসেছে, ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন লোকদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আমার খুব নিকটবর্তী হবে, যে ব্যক্তি তাদের মধ্যে আমার উপর অধিক পরিমাণ দুরুদ পাঠ করবে’ -(তিরমিজি)। দুরুদ পাঠে গুণাহ সমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। মার্জনা করা হয় বান্দার পাপসমূহ। হাদীস শরীফে তার বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, ‘হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দুরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তা’য়ালা তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। তার দশটি গুণাহ মাফ করে দেয়া হয় এবং তার জন্য মর্যাদার দশটি স্থর বৃদ্ধি করা হয়’ -(নাসায়ী)। দুরুদ পাঠের মাধ্যমে বান্দার প্রতি রহমত বর্ষিত হয়। হাদীস শরীফের বর্ণনানুযায়ী- ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দুরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন’ -(মুসলীম)। দুরুদ পাঠ বিশ্বনবী রাহমাতাল্লিল আলামীনের শাফায়াতকে আবশ্যক করে দেয়। প্রিয় নবীর বাণী, ‘হজরত রুওয়াইফা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দুরুদ পাঠ করে এবং দো’আ করার সময় বলে হে আল্লাহ! কিয়ামত দিবসে আপনি তাঁেক (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে) আপনার নিকট যে স্থান সম্মানীত, তা দান করুন। তার জন্য আমার সুপারিশ আবশ্যক হয়ে যায়’ -(আহমদ)। ফেরেশতাগণ দুরুদ পাঠকারী বান্দার প্রতি রহমত বর্ষণ করতে থাকেন। ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর একবার দুরুদ পাঠ করে, মহান আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ তার উপর সত্তর বার অনুগ্রহ বর্ষণ করেন’ -(আহমদ)
দুরুদ পাঠে দো’আ কবুল বা গৃহীত হয়। হজরত উমর রা. দুরুদ পাঠকে দো’আ কবুলের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করে বলেন-‘অবশ্যই দো’আ আসমান ও জমীনের মধ্যবর্তী শুন্যস্থানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। এর কিছুই উপরের দিকে উঠে না, অর্থাৎ কবুল করা হয় না, যতক্ষণ না রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দুরুদ পাঠ করা হয়’ -(তিরমিজি)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দুরুদ বা সালাম পেশ করা হলে সালামের জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর প্রদান করেন। হাদীস শরীফের ভাষ্যমতে- ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন কোন ব্যক্তি আমার উপর সালাম পৌঁছায়, তখন মহান আল্লাহ আমার রূহ আমার কাছে ফিরিয়ে দেন। যেন আমি তার সালামের প্রত্যুত্তর দিতে সমর্থ হই। অর্থাৎ আমি বলি ওয়া আলাইকাস সালাম’ -(আবু দাউদ, বায়হাকী)। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, দুনিয়ার যে কোন প্রান্ত হতে দুরুদ পাঠ করা হলে ফেরেশতাগণের মাধ্যমে তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে পৌছাঁনো হয়। সে জন্য আল্লাহ তা’আলা কতিপয় ফেরেশতাদেরকে নিয়োজিত করে রেখেছেন। হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, মহান আল্লাহর কতিপয় ফেরেশতা আছেন, যারা দুনিয়াতে বিচরণ করতে থাকেন এবং আমার উম্মতের পক্ষ থেকে আমার নিকট সালাম পৌঁছে দেন’ -(নাসায়ী, দারেমী)।
সর্বোপরি এটা বলা উচিৎ যে, আমরা যেখানেই থাকি না কেন রাসুলের প্রতি বেশী বেশী দুরুদ পাঠ করা আবশ্যক। কেননা, রাসুলের পাশে গিয়ে দুরুদ পড়লে তা তিনি সরাসরি শুনতে পান। দূরে থেকে দুরুদ পড়লে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে পৌঁছানো হয়। ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার কবরের কাছে এসে আমার প্রতি দুরুদ পাঠ করে, আমি তা সরাসরি শুনতে পাই। আর যে ব্যক্তি দূর থেকে আমার উপর দুরুদ পাঠ করে, তা আমার কাছে পৌছেঁ দেয়া হবে’ -(রায়হাকী)। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাঁর হাবীবের প্রতি বেশী করে দুরুদ পাঠ করার তাওফিক প্রদান করেন। আমীন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *