খোদাভীতির উজ্জ্বল নমুনা

৬৫. একবার ঈদুল ফিতরের দিন সম্মানিত সাহাবিগণ সাইয়্যিদুনা হজরত ওমর ফারুক রাদ্বি.’র ঘর পৌঁছলেন। ঘরের দরজায় সংকেত দিলে তিনি দরজা খুললেন। সাহাবায়ে কেরাম দেখলেন হজরত ওমর রাদ্বি.’র চক্ষু যুগল থেকে পানি ঝরছে। কেউ আরজ করলেন, ‘আমিরুল মু’মিনীন! আজতো খুশির দিন; কিন্তু আপনার নুরানী চেহারায় শোকের ছাপ। তদুপরি চোখেও পানি কেন?’ তিনি অতি নম্রসুরে এরশাদ করলেন, ‘আজতো খুশির দিন-একথা ঠিক; কিন্তু ওইসব লোকের জন্য, যাদের ইবাদাতগুলো আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হয়েছে। আর আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমি তো জানি না, আমার ইবাদাতগুলো কবুল হলো কি না?’ (ফয়মানে সুন্নাত)
৬৬. হজরত দাউদ আলাইহিম সালাম আপন হুজরায় বসে ‘যাবুর শরিফ’ পাঠ করছিলেন। দেখলেন মাটির ভিতর থেকে একটা লাল রঙের বিচ্ছু বের হয়ে আসলো। তিনি (দাউদ আ.) মনে মনে বললেন, ‘এ বিচ্ছুটাকে আল্লাহ তায়ালা কি কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন?’ তখন আল্লাহ তায়ালা বিচ্ছুটাকে নির্দেশ করলেন, আর সেটা বলে উঠলো, ‘হে আল্লাহর নবী, আমার দিন এমনই অতিবাহিত হয় যে, আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আমার অন্তরে এ কথার প্রেরণা সৃষ্টি করেছেন যেন দৈনিক এক হাজার বার এটা পাঠ করি : সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর-অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাকের জন্য এবং মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই আর আল্লাহই সর্বাপেক্ষা বড়ো।


তাছাড়া আমার প্রতিটি রাত এভাবে অতিবাহিত হয় যে, রাতে আল্লাহ তায়ালা আমার অন্তরে এটার প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যেন আমি প্রতি রাতে এক হাজার বার নিম্নলিখিত দুরূদ শরিফ পাঠ করি : আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন্নাবিয়্যল উম্মিয়্যি ওয়া আলিহী ওয়া আসহাবিহী ওয়া সাল্লিম। অর্থাৎ, হে আল্লাহ তায়ালা, মুহাম্মদ নাবিয়্যিল উম্মিত’র উপর রহমত বর্ষণ করুন এবং তার পরিবার পরিজন ও সাহাবিদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।
(বিচ্ছু বলল) এখন আপনি কি কিছু বলতে চান হে নবী? হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম বিচ্ছুটাকে নিকৃষ্ট গণ্য করার লজ্জিত বোধ করলেন। আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে তাওবা করে ফেললেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করলেন। (মুকাম্মাফাতুল কুলুব)
৬৭. এক ব্যক্তি এক গোলাম ক্রয় করল। গোলামটি বলল, ‘হে আমার মুনিব, আমি তিনটি আরোপ করছি আপনার খেদমতে :
০১. আপনি আমাকে ফরজ নামাজ আদায় করতে বাধা দিবেন না; যখন এর সময় এসে যাবে।
০২. আপনি আমাকে দিনের বেলায় ইচ্ছা মতো কাজের নির্দেশ দিবেন, কিন্তু রাতে দিবেন না।
০৩. আপনার ঘরে আমার জন্য একটা কাযরা আলাদা করে দেবেন, যার ভিতর আমি ব্যতিত আর কেউ প্রবেশ করবে না।’
মনিব লোকটি বলল, আমি তোমার শর্তগুলো গ্রহণ করে নিলাম। অতঃপর ওই লোকটি বলল, তোমার জন্য কামরা পছন্দ করে নাও। সুতরাং গোলামটি একটা ভাঙ্গা-শীর্ণ কামরা বেছে নিল। এরপর লোকটি বলল, হে গোলাম! তুমি তা জীর্ণশীর্ণ কামরাটি কেন বেছে নিলে? গোলাম বলল, হে আমার মুনিব! আপনি কি জানেন না যে, ভাঙ্গা-শীর্ণ কামরাও আল্লাহর স্মরণে ও তাঁর জিকিরের বরকতে বাগানে পরিণত হয়ে যায়? সুতরাং ওই গোলাম দিনের বেলায় আপন মুনিবের খিদমত করতো আর রাতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করতো।
এভাবে কিছুদিন পর একদিন তার মুনিব ঘরে হাঁটতে হাঁটতে গোলামের কামরা পর্যন্ত পৌছে গেল। তখন দেখলো যে, কামরটা আলোকোজ্জ্বল। আর গোলাম সিজদারত। তার মাথার উপর আসমান ও জমিনের মধ্যখানে একটা জ্বলন্ত ফানুস ঝুলন্ত রয়েছে। আর গোলাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে কাকুতি মিনতি ও কান্নাজড়িত কন্ঠে মোনাজাত করছে, হে আল্লাহ! তুমি দিনের বেলায় আমার মুনিবের প্রতি কর্তব্য এবং তার খিদমত অপরিহার্য করে দিয়েছ। যদি এ ব্যস্ততাটা না থাকতো, তবে আমি দিন-রাত শুধু তোমারই ইবাদতে মশগুল থাকতাম। এ কারণে হে আমার প্রতিপালক, আমার অপারগতাকে কবুল করে নিন! মুনিব এটা দেখতে থাকলেন, এভাবে ভোর হয়ে গেলো। তখন আলোকিত ফানুসটি ফিরে গেলো এবং ঘরের ছাদটা মিলে গেলো। এ দৃশ্য দেখে মনিব ফিরে আসলো। পূর্ণ ঘটনা তার স্ত্রীকে বলল। দ্বিতীয় রাত সে তার স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে গোলামের দরজায় আসলো। দেখলো গোলাম সিজদায় পড়ে আছে আর ফানুস তার মাথার উপর আলো দিচ্ছে। তারা উভয়ে দাঁড়িয়ে ওই দৃশ্যটি দেখছিল আর (খোদার ভয়ে) কাঁদছিলো। শেষ ভোর হরে তারা গোলামকে ডেকে বলল, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে আজ থেকে আজাদ। যাতে তুমি সেই অপারগতা (আল্লাহর দরবারে) পেশ করেছিলে তার দূরীভূত হয়ে যায় এবং তুমি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতে পারো।
তখন গোলাম তার মাথা আসমানের দিকে উঠালো আর বলল, ইয়া সা-হিবাস্ র্সিরি ইন্নাস র্সিরা ক্বাদ জাহারা, ওয়া লা-উদীরু হায়া-তী বা’দা মাশ্তাহারা।
অর্থাৎ, হে রহস্যের মালিক! এখনতো রহস্য ফাঁস হয়ে গেলো। রহস্য প্রকাশ হবার পর আমি আর বাঁচতে চাই না। এ পঙক্তি পাঠ করেই গোলাম মাটিতে লুটিয়ে পড়লো এবং তার রূহ তার দেহরূপী পিঞ্জিরা থেকে মুক্ত হয়ে উড়ে গেলো। অর্থাৎ, মারা গেলো। ইন্নলিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। (মুকাশাফাতুল কুলুব)

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *