অঙ্গীকার (৪র্থ পর্ব)

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাদিয়াকে কোনভাবে বুঝিয়েও আবরারের সাথে বিয়ের জন্য রাজি করানো যায়নি। ওর এক কথা ও এই লোককে বিয়ে করবেনা। এতে যদি সবাই ওর সাথে জোর করে তাহলে ওর দুচোখ যেদিকে যায় ও সেদিকে চলে যাবে।
অগত্যা আর কেউ জোর করেনি। হিতে বিপরীত হতে কতক্ষণ। আজকালকার ছেলেমেয়ে গুলো বড্ড একরোখা। এদের উপর কোন বিষয় নিয়ে জোরাজুরি করলে হয় এরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় আর নয়তো আত্মহত্যা করে বসে।
এইতো কয়মাস আগে সামিয়ার ক্লাসের এক মেয়েকে পরীক্ষাই নকল করার অপরাধে স্যার একটু বকেছে বলেছে জে এস সি পরীক্ষা দিতে দিবেনা। সেদিনের পরীক্ষাটা দিতে দেয়নি। বাড়িতে গিয়ে কি জবাব দিবে এই ভয়ে মেয়েটা বাজার থেকে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে বাড়িতে গিয়েছিলো। বাড়ি যাওয়ার পর মা যখন জিজ্ঞেস করছিলো এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলি কেন। পরীক্ষা দিসনি নাকি?
মেয়ে কোন জবাব দেয়নি দেখে মা তাকে এলোপাতাড়ি কয়েকটা চড় থাপ্পড় দিলো। এদিকে খেয়েছে ঔষধ ওদিকে মায়ের মাইর সব কিছুর ধকল নিতে না পেরে মেয়েটা ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে সাথে সাথে মারা গেলো। এরকম হাজারো নজির আছে আমাদের সমাজে।
তাই রেগে গিয়ে অভিভাবকদের এমন কিছু করা ও বলা কোনটাই ঠিক না। এই বয়সে ছেলে মেয়েদের আবেগ বেশি থাকে আবেগের ঝাপটা সামলাতে না পেরে এরা এই ভুল সিদ্ধান্ত গুলো নিয়ে ফেলে।
কেউ আর রাদিয়াকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। সবকিছু আগের মত চলছিলো।
কয়দিন পরে আফিয়া শশুরবাড়ি গিয়ে উনাদের সাথে দেখা করে আবার চলে এলো। শাফী বলেছে এ বাড়িতে থাকতে। ওর বাবা কিছুটা অসুস্থ হওয়ার দরুণ মা বাবার সেবাযতœ করতে গিয়ে হাঁফিয়ে যাচ্ছে সেখানে আফিয়ার অসুস্থতার সময় দেখাশুনা করতে পারবে না উনি। এ বাড়িতে তো সবাই আছে ওকে দেখে রাখার জন্য তাই ভেবে ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর শাফীও মাঝে মাঝে আসে ওর ডাক্তার চেকাপ করানো থেকে শুরু সব তো ওরই দায়িত্ব।
রাদিয়া অনার্সে একাউন্টিংয়ে চান্স পেয়েছে। ভার্সিটিতে যাচ্ছে আসছে এই নিয়ে চলছে দিন। আফিয়ার কড়াকড়িতে এখন মোটামুটি পর্দা মেনে চলার চেষ্টা করছে। নামাজও এখন নিয়মিত পড়ে।
সেদিন আফিয়া বললো, দেখ রাদি তুই আমাদের ভয় পেয়ে যদি ইসলামের ফরয নিয়ম কানুন গুলো মেনে চলিস তাহলে কোন দরকার নেই এ মানার। আল্লাহকে ভয় না পেয়ে আমাকে ভয় পেলে হবে না। এ মানার জন্য আল্লাহ আর তার রাসূল বলেনি। মানতে হলে সঠিকভাবে ইসলামের বিধি নিষেধগুলো পুরাপুরি মেনে চলবি না হলে না। অর্ধেক মানবি অর্ধেক মানবিনা এটার জন্য আল্লাহ বলেনি। আমি শুনেছি তুই নাকি ভার্সিটি গিয়ে মুখ খুলে ফেলিস এটা কিন্তু মোটেও ঠিক করছিস না।
-আপু কি করবো? মুখ বেঁধে রাখলে ভার্সিটির টিচাররা নানান কথা শুনায়। ওদের কথা হলো এতো পর্দা করার ইচ্ছে থাকলে বাড়িতে বসে থাকলেই পারো, ভার্সিটি আসার কি দরকার? সেজন্য বাধ্য হয়েই..
-রাদি কে কি বললো তাতে তোর কি? আমি তো আরো বেশি শুনেছি। আমাকে নিয়ে আমার সামনে পিছনে অনেক সমালোচনা হতো কিন্তু আমি কখনো সেগুলোতে কান দেইনি নিজের ঈমানের উপর অটল ছিলাম। ওদের মত মানুষের জন্য আমি কেন আমার জিন্দেগী নষ্ট করবো। আমার হিসাব আমাকেই দিতে হবে কেউ আসবে না হাশরের মাঠে আমার জন্য জবাবদিহি করতে। নিজের ভালো চাইবি অন্যের কথা ভাবতে গেলে পস্তাতে হবে।
আজ শুক্রবার রাদিয়া বাসায় ছিলো নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে শুয়ে ছিলো। শাফী আফিয়াকে নিয়ে চেকাপ করাতে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। কারো ফোন আসাতে রাদিয়া শুধুমাত্র ওড়না পরেই মাকে বলে বেরিয়ে গেলো। মুনিরা হয়তো ভেবেছে পাশের বাসায় যাবে তাই সেভাবে কিছু বলেনি।
শাফী আফিয়াকে নিয়ে বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামতেই আফিয়ার চোখ গেলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাদিয়ার দিকে। রাদি একটা ছেলের সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলো। এ দৃশ্য দেখে আফিয়া মনে মনে ইন্নালিল্লাহ্ পড়ে নিলো। সম্ভবত শাফী ওই দিকের ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে। আফিয়াকে এভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাফী না বোঝার ভান করে বললো, আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন চলো এ বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। পুরো ঘটনার আকস্মিকতায় আফিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো। এ কি দেখলাম আমি? রাদি ওই ছেলের সাথে কি সম্পর্ক ওদের? ওরা এভাবে হেসে হেসে কথা কেন বলছে? আর এভাবে বেপর্দা হয়ে!
ডোরবেলের আওয়াজে সামিহা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। শাফী আফিয়াকে নিয়ে সোজা রুমে চলে গেলো। মুনিরা মেয়ে এসেছে দেখে রুমের দিকে আসলো।
শাফীকে জিজ্ঞেস করলো, ডাক্তার কি বলেছে?
-জী মা সব ঠিকঠাক আছে। তবে ওর প্রেশারটা একটু বাড়তি।
-প্রেশার কেন বাড়বে? কি নিয়ে চিন্তা করিস তুই? মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো মুনিরা।
-শাফী বললো, মা আমিও এই জিনিসটা বুঝি না ওর কিসের চিন্তা।
শাফী ওয়াশরুমের দিকে যেতেই আফিয়া তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, রাদি কোথায় মা?
-একটু আগে বেরিয়েছে বলেছে চলে আসবে।
-বেরিয়েছে মানে কি মা? তোমার সামনে দিয়ে ড্যাংড্যাং করে বেরিয়ে গেলো তুমি কিচ্ছু বলোনি। তোমার আশকারা পেয়ে ওর সাহস বাড়ছে।
-কি হয়েছে বলবি তো?
-তোমার মেয়ে বাসার নিচে দাঁড়িয়ে কোন ছেলের সাথে কথা বলতেছে।
-কি বলছিস?


-আজ ও বাসায় আসলে ওর একদিন কি আমার একদিন! এতো সাহস আসে কোত্থেকে? এতো বুঝায় তাতেও ওর কিছুই আসে যায় না। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে আমি কি করবো তা ভালো করে জানো মা।
-শাফী ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে কথাটা শুনতে পেয়ে বললো, কি শুরু করছো টা কি তুমি? রাগারাগি করলে সব সমাধান হয়ে যাবে নাকি? ঠান্ডা মাথায় ওর সাথে কথা বলো। ওকে বুঝানোর চেষ্টা করো। অযথা রাগারাগির কোন মানে হয়? ছোট মানুষ এখনো ভালো খারাপ গুলো বুঝতে পারেনি হয়তো তাই।
-কিন্তু…
-কোন কিন্তু নয়। বাসায় আসুক আসলে আগে ওর সাথে কথা বলো। তারপর যা বলার বলবে। ভালো করে বুঝাতে পারলে হয়তো ও বুঝবে। নিজের ভালো কে না চায়।
রাদিয়া নিচেই বোন দুলাভাইকে দেখেছিলো। রাহাত ওর নোটখাতাটা নিয়েছিলো এক সপ্তাহ আগে। এতোদিন বলার পরেও ও নাকি আনতে ভুলে যায়। কাল রাদিয়ার এটা লাগবেই সেজন্য রাহাতকে বলেছিলো নোটটা যেনো ওর বাসায় দিয়ে যায়। আর তা আনতে গিয়ে পড়েছে বিপদে।
বাসার দরজা খোলাই ছিলো। রাদিয়া ধীর পায়ে বাসায় ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে রুমের দিকে গেলো। মুনিরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, ছেলেটা কে?
-কোন ছেলে?
-যার সাথে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলছিলি।
-এ আমার ভার্সিটি ফ্রেন্ড।
-কয়দিন হলো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিস এর মধ্যে ছেলে ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেলেছিস? সে আবার বাসা পর্যন্ত এসে হাজির।
-মা ও শুধু আমার ফ্রেন্ড। পড়ালেখার বাহিরে ওর সাথে আমার অন্য কোন সম্পর্ক নেই বিশ্বাস করো। আর ওর কাছে আমার একটা নোট ছিলো সে এটা দিতে এসেছিলো।
-এই মেয়ে তোর নোট ওর কাছে থাকবে কেনো? তোকে ছেলেদের সাথে মিশতে না করেছি না। তুই আমাদের মান সন্মান নষ্ট করে ছাড়বি নাকি?
-মা এতে মানসন্মান নষ্ট হওয়ার কি আছে? আমি শুধু কথাই বলেছি।
-এই বেয়াদব মেয়ে মুখে মুখে কথা বলছিস কোন সাহসে। সবাই বলবে আমার মেয়ে বেপর্দা হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলছে আর এতে আমি আনন্দিত হবো। এতো যদি দরকার হতো ওকে বাসায় আসতে বলিস নি কেনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিসের কথা?
-বাসায় আসলে তোমরা কি না কি মনে করল সেই জন্য তো আসতে বলিনি।
-বাব্বাহ অনেক কিছু বুঝিস। তোর ভার্সিটিতে কি মেয়ের অভাব আছে যে ছেলেদের সাথে কথা বলতে হবে ওদের বন্ধু বানাতে হবে। আর ওই ছেলে জেনেশুনে তোর কাছ থেকে নোট নিবে কেনো? ওখানে কোন ছেলে নাই নাকি?
তুই একটাই আমার পরিবারের মান সন্মান ডুবানোর জন্য যথেষ্ট। তোকে জন্ম দেয়াটা আমার ভুল হয়েছে। মরতে পারিস না তুই! তোর জন্য আমার অন্য মেয়েগুলোর সন্মান নষ্ট হবে এ বলে মুনিরা রাদিয়াকে কয়েকটা চড় থাপ্পড় দিলো।
আফিয়া এসে মাকে থামালো, মা কি করছো কি? এভাবে চিৎকার করে লোক জানাজানি করলে সন্মান বাড়বে না। গায়ে হাত দিচ্ছো কেনো? তোমাকে নিষেধ করিনি যাই করোনা কেনো কখনো গায়ে হাত দিবে না।
-রাদিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে ও কোন কথা বলেনি। সামান্য একটা ব্যাপারে মা ওর গায়ে হাত তুললো এটা ও মানতে পারছে না। সেই ছোটবেলায় মা ওর গায়ে হাত তুলেছে এতোদিন বকাঝকা করলেও কখনো গায়ে হাত তুলেনি কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ওর কাছে স্বপ্নের মতো মনে হলো।
ভেতর থেকে চিৎকার করে কান্নার শব্দ বেরিয়ে আসতে চাইছে কোনভাবে দম আটকে বললো, মা, তু, তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? আমি মরে গেলে তুমি খুশি হবে?
-আফিয়া ধমকে বললো, রাদি চুপ করবি!
মুনিরা হাঁফাচ্ছে প্রচন্ড ভাবে। আস্তে করে ধীর পায়ে বিছানায় গিয়ে বসলো কিছুক্ষণ পর ওখানে অচেতন হয়ে পড়লো। বেশি জোরে কথা বললো উনার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। মেয়েগুলোকে নিয়ে কত স্বপ্ন। আর ওরা! মাকে পড়ে যেতে দেখে রাদিয়া চিৎকার করে উঠলো। শাফীও রুম থেকে দৌঁড়ে আসলো। মাকে বিছানায় ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে চোখেমুখে পানির ছিটা দিলো শাফী। সামিহা ইনহেলারটা এনে দিলো। আফিয়া রাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, হয়েছিস তুই শান্তি? মা মরে গেলেই তোর মুক্তি হবে। কাঁদছিস কেনো তোর তো আনন্দ হওয়ার কথা!
রাদিয়া রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
শাফী আফিয়াকে ধমকে বললো, কি শুরু করছো কি তুমি? ভুল তো হতেই পারে সবাই মিলে ওকে এতো বকছো কেনো?
ভুল সবাই করে তুমি কি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবে তুমি কোন ভুল করো না। কতবার বলেছি রাগের মাথায় কিছু করো না কিন্তু তোমরা সবাই একরকম কারো থেকে কেউ কম না। এতো বড় মেয়ের গায়ে হাত তুলাটা কি ঠিক হয়েছে? মারলে যদি সব ঠিক হয়ে যেতো তাহলে তো মেরে মেরে মানুষকে সঠিক পথে আনা যেতো। যত্তসব!
আগেই তো নাগালছাড়া হয়েছে। আগে থেকে যদি কন্ট্রোলে রাখা হতো তাহলে এরকম বিগড়াতো না। এখন শাসন করে লাভ কি?
মুনিরা ঘন্টাখানেক পরে চোখ খুললো। রাদিয়া রুমে এসে মায়ের হাত ধরে বললো, মা আমার ভুল হয়েছে ক্ষমা করো। আর কখনো তোমাদের কথার অবাধ্য হবোনা। তারপরও তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। অঙ্গীকার করছি তোমার কাছে এবার থেকে তুমি আর বড় আপু যেভাবে বলবে আমি সেভাবে চলবো। সবকিছু ছাড়তে পারবো আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তোমার কিছু হলে আমি বাঁচবো না মা!
আফিয়া বললো, মা তুমি একটু বিশ্রাম নাও। রাদি তুই আমার সাথে আয় তোর সাথে কথা আছে …

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *