হাওরের দেশে

‘বাংলা তোমার ধুলো আমার অঙ্গে নেবো মেখে
বিশ্ব দেখার স্বাদ মেটাবো তোমায় দেখে দেখে।’
বাংলাদেশ! প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যেন এই দেশের প্রকৃতিতে আপন কুদরতে ঢেলে দিয়েছেন অপরূপ কিছু দৃশ্য যেগুলো দেখলে চক্ষু, হৃদয়, তনু সব-ই জুড়িয়ে যায়! এই দেশ দেখার পর যেন পুরো বিশ্ব দেখা হয়ে যায়। তামাম বিশ্বের সৌন্দর্যের প্রতীক যেন আমাদের এই জন্মভূমি।
আর এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই এ দেশে টেনে আনে নানান দেশের ভ্রমণ পিয়াসু মানুষকে। এ দেশের রূপে মুগ্ধ হন বিশ্ববরেণ্য পর্যটক ইবনে বতুতা।
এই ইবনে বতুতারই এক যোগ্য উত্তরসূরী যেন এই আমি। দিন-দুনিয়া চেনার পর থেকেই যেন ঘুরাঘুরির পিপাসাটা হৃদয়ে এক্কেবারে সেটে গেছে। ঘুরাঘুরি করতে, আল্লাহ তায়ালার এই নয়নাভিরাম সৃষ্টি জগত দেখতে কেমন যেন একটা নেশা কাজ করে ভেতরে। যদিও আর্থিক সংকটের দরুন মনের সবগুলো চাহিদা পুরণ কর তে পারি না। তবে এক্সট্রা খরচ তেমন করি না বলে মাঝেমাঝে একটু ঘুরাঘুরি করতে পারি। একটু সুযোগ এবং সময় পেলেই ছুটে যাই প্রকৃতির টানে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিবা শহরের আধুনিকায়ন দেখতে। যার ফলশ্র“তিতে এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় ৩০/৩৫টা পর্যটন এলাকা ইতোমধ্যে আমার বিচরণ করা হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় মজার বিষয় হলো কী জানেন? এমন কিছু মানুষের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে যারা ঠিক আমারই মতন ভ্রমণপিয়াসী বান্দা। যাদের নিয়ে এখন অব্ধি বাংলাদেশের বেশ কিছু পর্যটন স্থানে ভ্রমণ করা হয়ে গেছে অলরেডি। যার সর্বশেষ ভ্রমণটি ছিল হাওরের দেশ সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার টাংগুয়ার হাওর, বাংলাদেশের সুইজারল্যান্ড খ্যাত ‘নীলাদ্রি লেক’ যাকে সিরাজ লেক এবং ট্যাকেরঘাটও বলা হয়।
আসলে সুনামগঞ্জেও যে এতো সুন্দর দেখার মত স্থান আছে সেটা ওখানে না গেলে বুঝা বড় দায়!
প্রকৃতি যেন ঢেলে দিয়েছে সেখানটাতে। সবুজের এ কী সমারোহ! লেক, পাহাড়, হাওর, যাদুকাটা নদী সব মিলিয়ে এক অনন্যসাধারণ পর্যটন স্থান। আজ আপনাদের সেই অপরূপ দৃশ্যগুলো দেখে আসার গল্প শুনাবো।
ভ্রমণের পরিকল্পনা : যেহেতু আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই ভ্রমণ পিয়াসী সেহেতু আমাদের আড্ডার বিভিন্ন টপিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টপিক হলো ‘বেড়ানো’। এমনকি আমাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্র“পও আছে, যার নামটাই দিয়েছি ‘বেড়াইতাম’ যেখানে ঘুরাঘুরি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলে। তো সেদিন আলোচনা উঠলো এ মাসের শুরুর দিকে চলো কোথাও ঘুরে আসি। যেই কথা সেই কাজ। কিন্তু কোথায় যাওয়া? একজন প্রস্তাব করলো সুনামগঞ্জের তাহিরপুর নীলাদ্রি লেক এবং সেখানকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান। প্রস্তাব পাশ হলে তারিখ ঠিক করা হলো।
যাত্রা : নির্ধারিত তারিখে ভোর ছয়টায় আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সদস্য সংখ্যা ছয়জন। যদিও আরো কয়েকজন যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল তবে দুর্ভাগ্যবশত শেষ সময়ে এসে ওরা মিস করে ফেলে। এই ছয়জনের অবস্থানও এক জায়গায় নয়। চারজন সিলেট থেকে আর দুজন জগন্নাথপুর থেকে। যেহেতু আমরা দুইস্থানে আছি তাই ঠিক করলাম সুনামগঞ্জ এসে আমরা একত্রিত হবো। চারজন সিলেট শহর থেকে সুনামগঞ্জ, অপর দুজন আসবে জগন্নাথপুর থেকে, সেখানে ছয়জন একত্রিত হয়ে তাহিরপুরের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেবো। পরিকল্পনা মাফিক গেলাম সুনামগঞ্জ শহরে। ওরাও আসলো, যদিও আমার লেজি বিয়াই (হা. আব্দুল মজিদ) নির্ধারিত সময়ের মেলা পরে হাজির হলেন। সেখানে সকালের নাস্তা সেরে সিএনজি যোগে চলে গেলাম তাহিরপুর।
বিখ্যাত টাংগুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারে : আমাদের মূল টার্গেট নীলাদ্রি লেক হলেও ভ্রমনের পরিকল্পনায় সুনামগঞ্জের বিখ্যাত টাংগুয়ার হাওরও ছিল অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। যেখানে আছে ওয়াচ-টাওয়ার নামক একটা পর্যটন স্থান। এই ওয়াচ-টাওয়ার দেখতে হলে এমনকি, নীলাদ্রি লেক সহ অন্যান্য স্থান এই মৌসুমে নৌকা দিয়ে ভ্রমণ করাই বেটার। গেলাম তাহিরপুর নৌকাঘাটে। এখান থেকে নৌকা ভাড়া করা যায় বিভিন্ন প্যাকেজ সিস্টেমে। ১ দিনের প্যাকেজ, ১ দিন ১ রাতের প্যাকেজ, ২ দিন ২ রাতের প্যাকেজ ইত্যাদি। ভাড়া নেবে পর্যায়ক্রমে ৬০০০/ ৬৫০০/ ৭০০০ টাকা। এই প্যাকেজেই সবগুলো দর্শনীয় স্থান দেখিয়ে আনবে মাঝিরা। আমরা যেহেতু ছয়জন তাই তুলনামূলক একটা ছোট নাও রিজার্ভ করলাম।


প্রথমেই ওয়াচ টাওয়ারের উদ্দেশ্যে তরী ছাড়লাম। ঘণ্টাখানেক লাগলো ওয়াচ-টাওয়ারে যেতে। আহা! কী অসাধারণ দৃশ্য! বিশাল হাওরের মধ্যখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বিরাট উঁচু একটা টাওয়ার। যেখানে দাঁড়িয়ে প্রায় পুরোটা হাওর চোখের সামনে আসে। নিচে আছে পরিষ্কার ঝলমলে পানি। যেন স্বচ্ছ সরোবর। সাড়ি বাঁধা গাছ। এরকম স্থান দেখলে মন চায় লাফ মেরে নৌকা থেকে পড়ে যাই, গেলামও! মেতে উঠলাম নৈসর্গিক আনন্দে। শতশত মানুষ সেখানে আনন্দ করছে, ডুবছে, ভাসছে। কেউ বা নাচছে কেউ আবার গাইছে। ঘন্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে ছুটলাম নীলাদ্রীর উদ্দ্যেশ্যে।
নীলাদ্রি লেকে : ওয়াচ টাওয়ারে আনন্দঘন সময়টা কাটানোর পর আমাদের সাম্পান ছুটলো বাংলাদেশের সুইজারল্যান্ড খ্যাত সেই নীলাদ্রি লেকের উদ্দেশ্যে। প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নৌকা ভ্রমণ করে পৌঁছলাম লেকে। পৌঁছেই প্রথমে উদর ঠান্ডা করলাম। কিচ্ছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আসরের পর চলে গেলাম লেকে। এই সময়টাতেই লেকের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। লেকে গিয়ে ভাড়া নিলাম আরো একটা ছোট্ট তরী। যেটা দিয়ে শুধু লেকের জলে ঘুরব। নীলাদ্রির নীল জলে হারিয়ে গেলাম অনেকক্ষণ। লেকের চারপাশে ছোট ছোট সবুজ টিলাগুলো যেকোন মানুষের চোখ টানার জন্য যথেষ্ট। পাশেই ভারতের সীমান্তবর্তী পাহাড়। যা লেকের সৌন্দর্যকে আরো দ্বিগুণ করে দিয়েছে। নৌকা ছেড়ে দিয়ে লেকের চারপাশের টিলাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম, বেড়ানোর স্মৃতি ধরে রাখতে ক্যামেরায় কিছু স্থিরচিত্র তুলে নিলাম। সন্ধ্যের সময় লেকের জলে আবার গোসল করে নিলাম। গোসল করে একটা টিলায় বসে অনেকক্ষণ আড্ডা/মাস্তি হলো। হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে চলে আসলাম নৌকায়। রাত কাটাতে হবে এখানেই। চানাচুর, বিস্কুট, কলা ড্রিংকস নিলাম রাতের আড্ডার জন্য। সারারাত নৌকায় আড্ডা গল্প, গজল/কাসিদা গাইলাম। রাতটা হয়ে গেলো জীবনের অন্যতম মজার একটা স্মৃতিমধুর রাত।
শিমুলবাগান : রাতেই পরিকল্পনা ছিল সকালে শিমুলবাগানে যাবো। ভোর চারটায় মাঝি নাও ছেড়ে দিল। আড়াই ঘণ্টা পরে পৌঁছলাম তাহিরপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান শিমুলবাগানে। যদিও এখন বাগানে ফুল ফোটেনি (শীতকালে ফুল ফোটে) তবে বাগানের সারি সারি গাছ, সবুজ প্রকৃতি আপনার আঁখিদ্বয়কে তৃপ্ত করবে নিশ্চিত। মনকে করবে সতেজ। যেখানে গেলে কবিরা পেয়ে যায় তার কাব্যের উপকরণ। ফটোগ্রাফাররা পেয়ে যায় তার লেন্সের খোরাক। এক কথা নয়নাভিরাম দৃশ্য।
যাদুকাটা নদী : নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি নদীর নাম ‘যাদুকাটা’। যেটার অবস্থান সুনামগঞ্জের তাহিরপুরেই। আল্লাহর কুদরতের এক অপূর্ব নিদর্শন যেন এই নদী। কালামে পাকে পড়া আয়াত-‘মারাজাল বাহরায়নি ইয়াল তাক্বিয়ানি বায়নাহুমা বারযাখুল্লা ইয়াবগিয়ান’।
‘তিনি পাশাপাশি দুই দরিয়া প্রবাহিত করেছেন, এদের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরায়, যা তারা অতিক্রম করে না’ (সুরা আর রহমান)।
এরই বাস্তব উপমা যেন দেখলাম এই যাদুকাটা নদীতে। একই নদীতে দুই রঙ এর পানি! এক পাশের পানি অপর পাশে যায় না! অথচ নদীতে ঢেউ আছে। আল্লাহু আকবার! কী করে সম্ভব! আমার আল্লাহ কতই না শক্তিশালী! আপন রবের শক্তির প্রতি বিশ্বাসটা বেড়ে যায় আরো দ্বিগুণ হারে।
তখনই মনে পড়ে প্রভুর আরো একটি সুমহান বাণী-‘কুল সিরু ফিল আরদ্বি ফাংজুরু কায়ফা কানা আকিবাতুল মুকায্যিবীন’ (সুরা আনয়াম)।
হে রাসুল আপনি বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো আর দেখো; অবিশ্বাসীরা কীভাবে তা অস্বীকার করে?
বারেকটিলা : আমাদের সর্বশেষ দেখার স্থান ছিল যাদুকাটা নদী সংলগ্ন বারেকটিলা। আধাঘন্টার মত সময় সেখানে ঘুরে দেখলাম। সকালের নাস্তা নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
ফেরার পালা : যদিও আমাদের গ্র“পের সবাই ভ্রমণ পিয়াসী তবুও সবারই বাস্তবিক জীবনে ব্যস্ততা রয়েছে। চাইলেই কোথাও গিয়ে আনলিমিটেড সময় দেয়া যায় না। তাই অপরুপ এই সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানগুলোকে এক সময় বিদায় জানাতে হলো। ফেরার পথ ধরতেই হলো, মন না চাইতেও এক সময় বললাম-
ফিরতে হবে মায়ের কোলে
ডাক এসেছে তাই
হয়ত আবার আসবো কভু
এবার তবে যাই।
যাতায়াত নির্দেশনা : প্রথমে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ, বিরতিহীন বাস (ভাড়া ১০০ টাকা), লোকাল বাসেও যাওয়া যায়।
সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর, মটর সাইকেলে দুজন করে গেলে ৩০০ টাকা ভাড়া নেবে।
সিএনজি গেলে জনপ্রতি ১০০ টাকা নেবে।
তাহিরপুর গিয়ে নৌকা ঘাট থেকে উপরোল্লিখিত প্যাকেজে ভ্রমণ করতে পারেন প্রকৃতির অনন্যসাধারণ এই পর্যটন স্থানে। (থাকতে চাইলে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কাপড় নিতে পারেন)

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *